বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ভয় আর ভয়

ক্লাস শেষ করে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন উমাদি, দুচোখ দিয়ে জলের ধারা। দৃশ্যতঃ বড্ড বেসামাল। টিচার্স রুমে সবাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করে, কি হয়েছে? উমাদি বলেন, আজ তিনি ক্লাসে একজন কে শাস্তি দিয়েছেন। সবাই আরও অবাক হয়। শিক্ষক শিক্ষিকারা তো প্রয়োজনে শাস্তি দিতেই পারেন। উমাদি খুব বিষণ্ণ হয়ে বলেন, কাল হয়তো এই ছাত্রটি অনেক বড় হবে, তখন তার আত্মজীবনীতে লিখবে আজকের কথা। সেদিনের কথা ভেবেই তাঁর এই কষ্ট। ঘটনাটি অবেগ তাড়িত সন্দেহ নেই, তবে আরও যে সত্যটা বেরিয়ে আসে, তা হল বিশ্বাস। ছাত্রদের প্রতি বিশ্বাস। এই বিশ্বাসই ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করে, সত্যি সত্যি বড় হয়ে উঠতে। কোনদিন স্কুল জানালার ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে, ওই আকাশের রঙিন ঘুড়িরটার মতোই সে উড়াল দেয়, চাল ডালের দৈনন্দিন একঘেয়েমিতার বাইরে গিয়ে মানুষের মতো মানুষ হবার আকাঙ্খায়।

ঘটনাটি শুনেছিলাম শুভেন্দ্রর কাছে। কলকাতার পাঠভবনে পড়ত শুভেন্দ্র। উমাদি ছিলেন সেই পাঠভবনের শ্রদ্ধেয়া প্রতিষ্ঠাত্রী। শুনে বড় ঈর্ষা হয়েছিল, ওর সৌভাগ্য দেখে। এমন শিক্ষকের সান্নিধ্যে সব ছাত্ররা কেন আসেনা? ভালো ছাত্রদের প্রতি স্যারেরা বেশি স্নেহপরায়ণ হন। ব্যক্তিগতভাবে সেই পরিধিতে ঢোকার যোগ্যতা ছিলনা। আমাদের চারপাশটা ছিল অন্য রকম। স্যারেদের আমরা ভয় পেতেই শিখলাম। ক্লাসের বারান্দা থমথমে, টীচার্স রুম থেকে অন্য শিক্ষকরা ছুটে এসে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। ধুলিশায়ী একটি ছাত্র, আর তার উপর উপর্যুপরি বেত্রাঘাত করে চলেছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মশাই।  সাদা জামা রক্তাভ হয়ে উঠেছে। কখনও মারের চোটে বেত ভেঙে গেল। এমন দৃশ্য একবার নয়, মাঝে মাঝেই পীড়া দিত। কোন বিশেষ একজন শিক্ষক নন, এমন ছিলেন অনেকেই বা প্রত্যেকেই। আজ সময়ের সরণীতে পিছন ফিরে দুয়েকজনকেই মনে পড়ে, যিনি থার্ড ডিগ্রী ব্যবহার করেন নি।

ভয় গেঁথে গেছিল মনের ভেতর। এত ভয় যে স্কুলে আসার পথে, স্কুলের সাইনবোর্ড দেখলে অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত কেঁপে উঠত। সেদিনের শিক্ষকরা হয়তো বলবেন, এমনভাবে নিয়মানুবর্তিতা শেখানো হয়েছে বলে আজ কর্মক্ষম হয়েছি। হতে পারে, আমরা শিখেছি কি করে এক ছাঁচের কর্মী হতে পারি। তবে শৈশবের দিনগুলো যদি আরেকটু খোলামেলা হত, তবে স্কুল থেকে বড় চাকুরে, বা ডাক্তার ইঞ্জিনীয়ার ছাড়া, কয়েকটি খেলোয়াড়, শিল্পী, কবি  বা অন্য কোন উদ্ভাবনী পথে হাঁটার মানুষও তৈরী হত। কলকাতা ময়দানের বড় ক্লাবে খেলেছেন এমন স্বনামধন্য খেলোয়াড় আছেন যিনি আমাদের স্কুলে পড়তেন, তবে দুঃখের বিষয়, তিনি এই স্কুল থেকে মাধ্যমিকের গন্ডী পেরতে পারেননি। হয়তো শিক্ষককুল বলবেন এটা ছাত্রটির দূর্বলতা। তা নয়, স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতির দূর্বলতা, তাঁরা প্রতিটি ছাত্রকে তাদের মতো করে বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা করতে পারেননি। পেরেছেন কেবল একটিমাত্র নির্দিষ্ট ছাঁচ তৈরি করতে। সেই সাবধানী ছাঁচ থেকে এক ধরনের ছাত্রই প্রস্তুত হয়।

তখন বোধহয় ক্লাস সিক্স, হঠাৎ একদিন শুনলাম আমাদের সহপাঠী সম্রাট, নিজেকে ট্রেনলাইনে সঁপে দিয়েছে। কারণ একজন স্যার তাকে বলেছিলেন, পরেরদিন তিনি ওকে দেখে নেবেন। আজ মনে নেই, ঠিক কি দেখে নেবার কথা হয়েছিল। একটি বারো তেরো বছরের কিশোরের কাছে কিইবা দেখবার থাকে, পড়া সংক্রান্ত বাড়ির-কাজ ছাড়া? সম্রাট সেই স্যারের সম্মুখীণ হবার চেয়ে, চলন্ত ট্রেন কে কম ভীতিপ্রদ মনে করেছিল। আজও সম্রাটের মুখটা চোখের সামনে ভাসে। ছুটিছাটার দিনগুলোতে সম্রাট আমাদের বাড়িতে আসত। অনেক খেলাধুলায় সময় কেটেছে।

বিপ্লব বলে একটি ছেলে ছিল আমাদের ক্লাসে।  কোন পড়াতেই তার কোন আগ্রহ থাকতনা। একজন স্যার প্রতিদিন এসে তাকে গালমন্দ করতেন আর বলতেন, তুই বড় হয়ে ট্রেনে বাদাম ফেরি করবি। কারণ স্যারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তার চেয়ে বেশি যোগ্যতা সে অর্জন করতে পারবে না। অন্যদিকে সেই স্যার শুনেছি সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। এত ঋণাত্মক চিন্তা নিয়ে তিনি নিজেই নিজের শিক্ষকতার জীবনে স্থির থাকতে পারেননি। আজ সেই বিপ্লব কে খুঁজে বের করতে বড় ইচ্ছ হয়। সময়ের খেলাতে সে এখন কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে জানতে পেলে ভালো হত।

ক্লাসে পড়া না পারাতে, এক শিক্ষক একটি ছাত্রকে ডাস্টার দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। ছাত্র ঠ্যাঙাতে অনেকই কাঠের ডাস্টার ব্যবহার করতেন।  ক্লাস শেষ হয়ে গেছে, টিফিনের সময় সেই স্যার হয়তো অন্য কোন ক্লাস থেকে বেরিয়ে আগের ক্লাসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ সেই ছেলেটিকে দেখে, ঘরে ঢুকে আরও বার কয়েক ডাস্টার সহযোগে মেরে যান। এমনি করে ছেলেটি দিনের মধ্য প্রায় তিন-চার বার এক কারণের জন্য শাস্তি পায়। শেষে বাড়ির ফেরার পথে রেল স্টেশনে যখন দাঁড়িয়ে, ওকে দেখতে পেয়ে স্যারটি ওইখানেও অজস্র বাইরের মানুষের সামনে আবার প্রহার করেন।

স্যারেদের দাপটের সাথে সাথে, কঠোরতা ছিল নম্বর দেওয়াতেও। অনেক স্যারকে গর্বের সাথে বলতে শুনেছি, আমি ছেলে কে তিরিশ দেব, সেই ছেলে মাধ্যমিকে নব্বই পাবে। তখন সেই কথাগুলোকেই বেদবাক্য মনে হত। আজ মনে হয়, যে ছেলে নব্বই পাবার যোগ্য, তাকে তিরিশ দিয়ে হয়তো স্যার নিজের বিচার শক্তির অবমাননা করেছেন। তিনি অতি সাবধানী হয়ে ছেলেটিকে উপযুক্ত মান দিতে পারেননি। এই জন্য অনেক ছাত্র ক্লাস নাইন পর্যন্ত থেকে, শেষ ক্লাস অন্য স্কুলে পড়ে মাধ্যমিক দিয়েছে। তাতে আমাদের স্কুলের পরিসংখ্যান ঠিক থাকত, গড়ে প্রায় প্রত্যেকে ফার্স্ট ডিভিশন বা স্টারমার্ক। এখন খোঁজ নিলে দেখা যেতে পারে সেই ছেড়ে যাওয়া ছেলেরাও কোন অংশে কম নয়, তারাও জীবনের পরীক্ষাতে সসম্মানে উত্তীর্ণ।

স্কুলের শেষ পরীক্ষা ছিল ‘টেস্ট’ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলাফল ছিল একটি বিশেষ ছাঁকনি। ক্লাস ওয়ান থেকে ছাঁকতে ছাঁকতে, শেষের পরীক্ষাতে প্রায় তিনভাগ ছাত্রকে ছেঁটে ফেলা হত, যাতে মাধ্যমিকে স্কুলের অসাধারণ এক পরিসংখ্যান তৈরী হয়। এই ‘টেস্ট’ পরীক্ষাটি যেমন শক্ত হত, তেমনই কড়া, তার খাতা দেখা। ফল প্রকাশের দিন, খুব দুরুদুরু বুকে স্কুল প্রাঙ্গণে লাইন করে দাঁড়িয়ে। শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মহাশয় এসে বললেন, এত খারাপ রেজাল্ট হয়েছে, ছাত্রদের সুইসাইড করা উচিত। সামনে পনেরো ষোলো বছরের ছেলেরা, আর তাদের কে প্রধান শিক্ষক এই সম্ভাষণে প্ররোচিত করছেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। হয়তো ঘটনার গাম্ভীর্য উপলব্ধি করেছিলেন। তৎক্ষণাৎ অন্য কথা বলে অবস্থার নিয়ন্ত্রণ করেন, না হলে আরও কয়েকজনের নাম সম্রাটের পাশে লেখা হয়ে থাকত।

তুলনা করা হয়তো ঠিক নয়। আরেকটি স্কুলের এমন শেষদিনে তাদের মাস্টার মশাই বলছেনঃ

“প্রস্তুতিটা কেমন হল কমিয়ে দিয়ে নাওয়া খাওয়া?
এতদিনের স্কুল জীবনের এত রকম চাওয়া পাওয়া দেয়া নেয়া
একদিনের এই খাতার পাতায় সম্ভব তার বিচার হওয়া?
এপ্রিলস্য প্রথম দিনে এমনভাবে বোকা হওয়া যায় না সওয়া
গেলেই তবে সহজ হবে জীবন স্রোতে তরী বাওয়া।
পাঠ ভবন ছাড়বে বলে রঙ্গিন মনের ডানায় বুঝি লাগছে হাওয়া?
যতই বল বিদায়, তোমার যাওয়া তো নয় যাওয়া”।

একটা অবিচ্ছেদ্য বাঁধনে ছাত্র ছাত্রীদের বেঁধে রাখেলেন। আমরাও বেঁধে আছি, ভয়ে জড়সড় হয়ে।

বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

উইঙসের ওপারে

ঠিক কতটা পেলে পাওয়া হয়? প্রশ্নটা সহজ। উত্তর খোঁজাটা একলার হয়না। মানুষের ভেতর বাহির ঘিরে রাখে আরও অনেক কিছু। সম্পর্কের বীজ, মায়া মমতার ছাল বাকল। সময়ের ডালপালায় নিজেকে ঢেকে রাখে। এতগুলো ঝুরি নেমেছে চারিদিক দিয়ে, তার মধ্যে ঠিক কোনটা আমার কান্ড, সেই অবয়বটি হারিয়ে যায়। কতকটা, “পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি', মূর্তি ভাবে 'আমি দেব'” অবস্থা। নিজের নানারূপ দেখে আমরা নিজেরাই অস্থির। অথচ এই অস্তিত্বর সঙ্কট থেকে উদ্ধার করবে কে? গেরুয়া বসনের সন্ন্যাসী? যিনি এই ছাল বাকলের পর্দা এড়িয়ে একক সত্যের পথে চলেছেন। নাকি গর্ভগৃহে অধিষ্ঠান রত কোন দেবতার মন্ত্রপূতঃ ঔজ্জ্বল্য? অথবা অতিদূর কষ্ট সহ্যকারী কোন দূর্গম পথ, যা পার হবার পর যুধিষ্ঠিরের মত বলতে ইচ্ছা করে, আমি এসেছি। সাথে চিরসাথী পোষ্যটি। কিন্তু পোষ্যর সাথে নিজের জীবনের আয়ু এক নয়, তাই তাকে ‘চিরসখা ছেড়না’ বলে জড়ালেও প্রাকৃতিক নিয়মেই সে থাকবে না। অতয়েব সারবত্তা হল একলা এসেছি একলা যাবো, মাঝের এই ভেজাল যত বাড়বে, তত একলা মানুষটি হারিয়ে যাবে।

মেলার মাঝে যেমনটা হয়। একলা একলা হারিয়ে যাওয়া। আসেপাশে এদিক ওদিক, এমনকি উপর নিচেও মানুষ থাকতে পারে। উপর নিচে থাকে না? নাগরদোলা ছাড়া মেলা হয়? তবে উপর নিচও হল। আর সব অচেনা মানুষ। অচেনা অর্থ, আগে দেখিনি। কথা কইনি। তবু তারা গা ঘেঁষে চলে যায়, আলগোছে কথাও কয়। জীবনের মতো, ভীড় রেলগাড়িতে কতশত মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ গা ঘষাঘষি হল, তার কি কিছু রইল? না রাখা যায়। এ জগৎ তেমনটাই। তোমার আমার সুতোর বাঁধন জুড়তেও সময় লাগনা, ছিঁড়তেও না। এটুকুর জন্য এত মারপিট আর দাঙ্গা হাঙ্গামা করার কোন প্রয়োজন নেই। তাহলে কি সকলে দূরে দূরে থাকবে? এমনটাও হবার নয়। দূরে আছি মনে রেখে, কাছে থাকতে হবে। কি আব্দার! মায়ার বাঁধন কি একেই বলে? মহাত্মারা বলতে পারেন। আমি খুব সাধারন মাপের মঞ্চশিল্পী। না আছে ওজন, না আছে ছটা। যবনিকা না পড়া পর্যন্ত সহশিল্পীর সাথে সম্পর্ক, নাট্যকার, নির্দেশক যেমন বলে দিয়েছেন, তেমন। সে বাপ ছেলে, চোর পুলিশ, রাজা উজির যা কিছু হতে পারে। আবার উইঙস দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে অন্য ভাষা অন্য রূপ অন্য সম্পর্ক। তা জগৎএর উইঙস থেকে বেরিয়ে গেলে ঠিক কি হয়, সেটা জানিনা বলেই এত গোল। তা, থাকল না হয়, একটু রহস্য। চেনা স্টেশন পার হয়ে কোন অচেনা স্টেশনে গিয়ে নামব, সেটা সেই সময়ের জন্য তোলা থাকল। আবার কেউ কেউ বলেন, এই জগতে ঢোকা বেরনোর সময়গুলোতে স্মৃতি লোপ পায়, যন্ত্রে না কি এমনই প্রোগ্রাম করা আছে। বেশ তবে তাই থাকল। এত বছরে এত লোক ঢুকছে বেরচ্ছে, কই কেউ তো একবারের জন্য ঘুরে এসে বলছে না মঞ্চের অন্যদিকটা কেমন? তার নিশ্চিত কোন কারণ আছে। আর কিছু না-জানা থাকলেই ভয় জমতে থাকে। সেখানে নানা ব্যবসায়ী তাঁদের মতো করে ভয় দেখায় যাতে তাদের দুটো রোজগার হয়।

শেষের দিনে প্রশ্নটা অধরাই থাকল, আমি কে? আমার শরীরটা কি আমি? নিশ্চই তা নয়। তা না হলে, কেন বলি “আমার শরীরটা ভালো নেই”? আমার জামা, আমার জুতোর মতোই আমার শরীর। তাই আমি আর আমার জামা বা জুতো যেমন একজন নই, আমি আর আমার শরীরও আলাদা। কেমন হল তো? সেই কাক্কেশ্বরের হিসেবের মতো হল কি? তার মানে আমার শরীরটা যদি আমি না হলাম, তবে আমি কে? হতে পারে আমি এই শরীরটার মধ্যে থাকি। কিন্তু আমি যে শরীরটা নই, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। তা পরজন্ম থাকলেও নেই, না থাকলেও নেই।

অন্যদিকে সম্পর্কের সূত্র ধরা যাক। আমার সন্তানের পিতা কি আমি? স্ত্রীর স্বামী, পিতা মাতার সন্তান? যাঁরা আত্মা-তত্বে বিশ্বাসী, তাঁরা বলবেন আত্মার একটা আধার দরকার, সেই কারণে একজন পিতা মাতাকে প্রয়োজন। প্রকৃতির নিয়মে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্ত্বাকে তাঁরা ধারন করেছেন। এই স্বাধীন স্বত্ত্বাটির স্বরূপ কি? তিনি কোথায় থাকেন? জন্ম নেবার আগে ও পরে তাঁর অস্তিত্ব কেমন? লাল, হলুদ না গোলাপী? পৃথিবীর বুকে প্রায় চুরাশি হাজার জীব প্রজাতি আছে। তাদের মধ্যে একমাত্র মানুষ উপার্জন করে খায়। অন্যরা তেমন কিছু করে না। অথচ তারা কেউ না খেয়ে নেই। খেতে গিয়ে কাজ করতে হয়, কাজ করতে গিয়ে অবয়ব তৈরি হয়। সেই অবয়ব তখন আমার পরিচয় হয়ে চেপে বসে। উনি ডাক্তার, তিনি পুলিশ, সে দোকানদার এমন নানা রকমের কাজ আর নানা রকমের পরিচয়। তবে সে যে মানুষ, সেই ঘটনাটা গেল হারিয়ে। অতঃপর তিনি বৃদ্ধ হলেন, তাঁর শরীর থেকে ঝরে পড়ল পেশাগত মুখোশ। ব্যাস আর যায় কোথায়, ডাক্তার পুলিশ দোকানদার সব মিশে গেল। কখনও কখনও তাঁরা বিশ্বাস করতে চান না, কি শো শেষ হয়ে গেছে, মনে মনে নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে সংলাপ বলে যান। মধ্যিখান থেকে হারিয়ে যায় আমার আসল আমি-টা।

বড্ড গোলমাল বাধালে দেখছি। আচ্ছা একটু ওপর থেকে ভাবা যাক। এক্কেবারে ফাঁকা একটা জায়গা। অতীব অন্ধকার, বাতাস নেই, ধুলো নেই, কিচ্ছু নেই। সে এক অভাবনীয় নেই-রাজ্য। সেখানে অতিকায় পাথুরে, ধাতব, গ্যাসীয় গোলা। একটা দুটো নয়, কোটি কোটি তে। চিন্তার পরিধির সবচেয়ে বড় সংখ্যাটার চেয়েও বড়। পেল্লায় তার আকার। কেউ কেউ আবার খুব গরম, সততঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন। কেউ কেউ হিম হিম শীতল ঠান্ডা। আর অমন অতিপ্রাকৃত পরিবেশে এই রাক্ষুসে গোলারা বাঁই বাঁই করে ঘুরে চলেছে। কে ঘোরায়, কেনই বা ঘোরায়? তাই যদি হয় সেখানে, আমরা তার তুলনায় তো ধুলোর চেয়ে ক্ষুদ্র। আর আমদের রণ রক্ত সফলতা কোন পরিমাপেই আসেনা। তবে কি ধরে দিনগুলো কাটাবো? যেটাই করি, তাতে গোলমাল এসে যায়। ওই অত কোটি কোটি গোলকের মধ্যে এই পৃথিবী নামক গোলকটিতে এমন কেন হল বা কি করে হল? আর সেখানে হঠাৎ করে নিজের অস্তিত্ব আবিস্কার করে এমন আহ্লাদিত হবার কি হল?  অত দূর পর্যন্ত, যখন একান্ত পৌঁছানো যাচ্ছেনা, তখন এটুকুই সই। চোখ মেলে তাকাই, কান ভরে গান শুনি। আর ভাব করি ক্ষণস্থায়ী সহযাত্রীদের সাথে, তারা শুধু যে মানুষ তা নন, আরো যারা রয়েছে। এই পৃথিবী তাদেরও বাড়িঘর। প্রজাপতি, পাখি, পশু, পোকা মাকড় এদেরও সমান অধিকার। প্রত্যেকের নিজের নিজের মঞ্চসময় নির্দিষ্ট করা আছে। অভিনয় সাঙ্গ হলে বেরিয়ে যাওয়া দস্তুর। আবার ঢুকতে হবে কি না জানা নেই, তাই যতটুকু হাততালি এই সময়ের কাজের জন্য বরাদ্দ। উইঙস পার করে গেলে, ধরাচূড়া খসে গেলে আর কে চিনবে?


মঙ্গলবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

জলছাপ

বর্ষা নামে হৈচৈ করে। কারো কথা শুনতে দেয় না। রাস্তা জুড়ে কালো জল আর দু ধারের সবুজ গাছপালার বিরামহীন ভিজে যাওয়া। বেশ কিছু গবাদী প্রাণী গাছের নিচে গায়ে গায়ে ঘেঁষে থাকে। নির্বিকার চোখগুলো ঠিক করে পড়াও যাচ্ছেনা। শহর থেকে একটু দূরে, নতুন শিল্প নগরী বলে চিহ্নিত। যাওয়া কাজের সূত্রেই। এক টানা দেওয়া লম্বা মাঠের ওপর আকাশ কেমন ঝুঁকে পরে জল ঢালছে। কাজের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে জলের ছাট এসে যায়। নিরালম্ব মন ভিজে কাকের মত জড়সড় হয়ে বসে। মাঠে উঁচু উঁচু ঘাস। তার গায় বেয়ে জল ডিঙিয়ে যাচ্ছে ঢোঁড়া সাপ।

টাকা তুলতে একটি এটিএম-এ। লম্বা লাইন। বৃষ্টি একক ভাবে জানান দিয়ে চলেছে। একটা মাত্র যন্ত্র কাজ করছে। বেশ ভীড় জমেছে। আসে পাশে লোকজন বেশিরভাগ শ্রমজীবি হিন্দিভাষী মানুষ। এমন দুটি অল্প বয়সী ছেলে গল্প করছে। হিন্দী বাচনভঙ্গীতে বলে, "বাবুরাম সাপুরে, কোথা যাস বাপুরে। আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা।" আমি চমকে তাকাই। একটু আগের ঢোঁড়া সাপটি নিজের অস্তিত্ব রেখে গেছে।  আমার চোখের আতিথ্য দেখে, ছেলেটি উৎসাহ পায়। বলে, আরও একটা কবিতা জানি। বুঝতে পারি, অন্য ছেলেটি একেবারে বাংলা জানেনা। অতটা আনন্দ পাচ্ছে না। জিজ্ঞেস করে, ফারসি কোন কবিতা জানে কি না। প্রথম ছেলেটি অদমনীয়। এবার, বাইরে বৃষ্টি দেখে ভাঙা বাংলায় কবিতা বলে, "বিষ্টি পোরে টাপুর টুপুর নোদে আলো বান"। আমি মন দিয়ে ফেলি, ভাবি পরের লাইনগুলো ধরিয়ে দি। ছেলে ভোলানো ছড়া। কেউ কোনদিন হয়তো কানে দিয়েছিল। আবার নিজে থেকে বলে, "দুসরা লাইন ভি থা, ঝাপসা গাছপালা"। এবার আমার গা ছমছম করে ওঠে। এতো রবিঠাকুর! আমি এবার সত্যি ভিজে যাই। আমার প্রাণের একটি তার ছেলেটি হঠাৎ করে ছুঁয়ে দিল, নিজের অজান্তে।

“দিনের আলো নিবে এল,
সুয্যি ডোবে - ডোবে।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে
চাঁদের লোভে লোভে।
মেঘের উপর মেঘ করেছে-
রঙের উপর রঙ,
মন্দিরেতে কাঁসর ঘন্টা।
বাজল ঠঙ ঠঙ।
ও পারেতে বিষ্টি এল,
ঝাপসা গাছপালা।
এ পারেতে মেঘের মাথায়
একশো মানিক জ্বালা।
বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান-

'বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,
নদেয় এল বান' ”

দিন কাটিয়ে সন্ধ্যে নামার আগে শহরে ফেরার পথে। বর্ষার এখনও কোন বিরতি নেই।  সমস্ত জমে থাকা ভালো লাগা, না শুকোনো জামার মত তিতকুটে। শহরের চারিদিকে জল জল আর জল। তার মধ্য দিয়ে গাড়ি চলছে। জলযানের দুলুনি অকারণ ভীতিপ্রদ হয়ে যায়। আরেক দফা আলাপচারি শেষ হয়, তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়া সর্ষেদানার মত ভেজা মানুষ, ভেজা ছাতা, ছপ ছপ। ফুটপাথ  কোথায়, কোথায় নিকাশি নালা আর কোথায় বা রাস্তা, সব একাকার। তার মধ্যেই হা পিত্যেশ করে ভাড়া-গাড়ির খোঁজ। ফোন-গাড়িরা বেপাত্তা। সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, অনুনয় করলেও দাঁড়ায় না। শেষে এক বৃদ্ধ ট্যাক্সিওয়ালা রাজি হলেন।  আমরা সবে উঠেছি, কোথা থেকে আর একটি লোক দৌড়ে এসে বলল, একটু বড় রাস্তা অবধি নামিয়ে দিন, সামনে অনেক জল। তারপর যানজট জল পার হয়ে আপিস এলাম, রাত তখন আটটা। গাড়িতে ফোন ফেলে নেমে পড়েছি। সেই ট্যাক্সি চালক আবার এসে ফেরত দিয়ে গেলেন। তারপর আপিস করে, এক শহর ভরা জল ডিঙিয়ে, গাড়ি চালিয়ে বাড়ি আসা। গাড়ি ধীরে চলছে। প্রায় দু ঘন্টা লাগল ঘরে ঢুকতে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘুরতে হল অনেক। আটকে যেতে পারতাম, যেকোন জায়গায়। ইষ্টনাম জপতে জপতে ফেরা। রাতের শহরে. সে আরেক রোমহর্ষক অধ্যায়।

বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মাঠের স্কুল-১

আমাকে প্রধান শিক্ষকের ঘরে ডেকে পাঠানো হল, কেন আজ মনে নেই। সাথে নিম্নবুনিয়াদী থেকে প্রাপ্ত শেষ ফলাফলের কাগজটা ছিল। ওটাই সম্ভবতঃ মাঠের স্কুলে আমার প্রথমদিন। প্রধান শিক্ষক অমরশঙ্কর, যাঁর গেরুয়া প্রবর্তিত নাম হয়েছে স্বামী বোধাতিতানন্দ। তবে একেবারে ছেলেবেলায় তাঁকে অমরশঙ্কর নামে চিনেছিলাম, সেই নামটিতে তিনি সারা জীবন পরিচিত হয়ে ছিলেন, অন্ততঃ আমাদের সময়ের কাছে। ঘরের ভিতর আরেকজন বর্ষীয়াণ শিক্ষক ছিলেন। পরে জেনেছি, ওঁনার নাম শশাঙ্ক শেখর তেওয়ারি, ছোট করে এস.এস.টি স্যার। আমার ফলাফলের কাগজ হাতে নিয়ে বলেছিলেন, ‘মিডিওকার’। সেই মুহুর্তে মানে বুঝতে পারিনি। পরে বাংলা প্রতিশব্দ জেনে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। নিজেকে নিয়ে ভাবতে আর গৌরবান্বিত হতে অনেকেরই ইচ্ছা থাকে। অবচেতনে হয়তো আমারও তেমন কোন আকাঙ্খা ছিল। মুখের ওপর কেউ আমায় নেহাত মাঝারি বলায়, দশ বছরের বালক মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। আজও সেই দিনটার কথা মনের মধ্যে বয়ে নিয়ে চলেছি। আবার পুরো স্কুল জীবনে, এই এস.এস.টি স্যারের কাছেই আরেকটি মন্তব্য পেয়ছিলাম। একই সাথে সেই দিনটাও স্মৃতিতে গেঁথে রয়েছে। এস.এস.টি স্যার বাংলা পড়াতেন। সেই সময়, আমাদের স্কুলে পড়ানোর ধরনটা ছিল, খুব সাবধানী। স্যারেরা নিজেরাই প্রশ্ন এবং উত্তর লিখে দিতেন। ছাত্রর দায়িত্ব ছিল সেটা মুখস্থ করে খাতায় ওগড়ানো। চেনা লেখা পেলে তবেই ভালো নম্বর আসত, নচেৎ নয়। আমি ছিলাম ফাঁকিবাজ ছাত্র। গড়গড়িয়ে স্যারের লেখা মুখস্থ করাতে বড় আলস্য। যা বুঝতাম নিজে নিজেই লেখার চেষ্টা করতাম। এমনই একদিন আমার কোন একটি উত্তর পত্র দেখে স্যার বলেছিলেন, “ক্লাসের মধ্যে একমাত্র ছাত্র, যে মৌলিক রচনা লিখতে পারে”। অচিরেই বুঝতাম স্যার আমায় একটু স্নেহের চোখে দেখছেন।

স্কুলের মধ্যেই সিনেমা হল। আমাদের কাছে ছিল বিষ্ময়! বিবেকানন্দ হল, শুধুমাত্র সিনেমা হল নয়। নিয়মিত আবৃত্তি, গান, বিতর্ক, বক্তৃতা প্রতিযোগিতার অঙ্গন। আর প্রতিটি অনুষ্ঠানের মূল কান্ডারী ছিলেন এস.এস.টি স্যার। ছেলেদের মধ্যে মৌলিক বিদ্যাবৃত্তির চর্চার প্রতি তাঁর অপরিসীম উৎসাহ। সঙ্গে আরেকজন অল্প বয়সী উদ্যোমী শিক্ষক যোগ দিলেন, তাঁর নাম স্বরূপ নন্দ, সংক্ষেপে এস.এন। একবার এস.এন স্যার দুই কবিয়ালের লড়াই করার মতো কবিতায় গান বেঁধে দিলেন। ব্যাস সেই নিয়ে তৈরি হল কবির লড়াই। আশ্রমের দিপক বাজাত ঢোল আর আরেকজন কাঁসর। কবিয়ালের ভূমিকায় কারা অভিনয় করত, এখন আর মনে নেই। তবে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সেই পালা। বাৎসরিক উৎসব প্রাঙ্গন সহ একাধিকবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই কবির লড়াইএর মহড়ার সময় আমিও অনেক সময় থেকেছি কবিতা, বক্তৃতা বা অন্য কোন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির জন্য। শুনে শুনে পুরোটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। আজও বেশ কয়েকটা পদ মনে আছে। বিবেকানন্দ হলের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে নানা অজুহাতে মঞ্চে থাকার সুযোগ মিলত, কখনও প্রতিযোগী বা কখনও সঞ্চালক রূপে। এই অভ্যাসটি পরবর্তী ক্ষেত্রে মঞ্চভীতি কাটিয়ে দিতে পেরেছিল। ‘পাব্লিক স্পিকিং’ বা কোন দলের সামনে কিছু বলতে অনেক বিদগ্ধ মানুষেরও অনেক সমস্যা হয়, বিবেকানন্দ হলের সেই দিনগুলো ভিত গড়ে দিয়েছিল।

মাঠের স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে ভীতিপ্রদ ছিলেন পি.এম স্যার। পুরো নামা জানার সহস হয়নি কখনও। স্যার কে তেমন মারধর বা বকাবকি করতেও কখনও দেখিনি। তবু ধুতি পাঞ্জাবী পরা এই স্যার ছিলেন যেন সাক্ষাৎ বিভীষিকা। বারান্দা দিয়ে হেঁটে গেলেই ক্লাসের কোলাহল থেমে যেত। এমন নৈঃশব্দ সৃষ্টিকারী তিনজন ছিলেন। পি.এম স্যার ছাড়া হাইস্কুলের সন্তোষবাবু এবং স্বয়ং অমর শঙ্কর। অন্য দুজন বেত হাতেও সমান দক্ষ ছিলেন।

দত্ত স্যার ভূগোল পড়াতেন। একবার বোর্ডে ভারতবর্ষের ম্যাপ এঁকেছিলেন। কেউ একজন খুব বিষ্ময়সূচক মুখে জিজ্ঞেস করেছিল, ওটা কোন পাখির ছবি কি না? স্যার রেগে তাকে ক্লাসের বাইরে বার করে দেন। নিম্নবুনিয়াদী তে শাস্তি পাওয়া ভয়ের ব্যাপার ছিল, একটু উঁচু ক্লাসে উঠে শাস্তিটাও বেশ মজার হয়ে উঠল। গৌর ভুঁইয়া (জি.বি.) নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। তার কাছে শাস্তি পাওয়ার জন্য রীতিমত হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। খুব নিরীহ প্রকৃতির ছোটখাটো চেহারার মানুষ ছিলেন জি.বি.। বেশিরভাগ ছাত্র তখন তার চেয়ে উচ্চতায় বেশি হয়ে গেছে। ক্লাসে বেত নিয়ে আসতেন। বেত কে উনি ‘ছড়ি’ বলতেন। ছেলেরা অন্যায় করলে সেই ছড়ি দিয়ে হাতে আঘাত করতেন। বড় বড় ছেলেদের হাতের নাগাল পেতে তাঁকে লাফিয়ে লাফিয়ে প্লাটফর্মের ওপর উঠতে হত, সেই দেখেই আমাদের আমোদের শেষ ছিলনা।

শুভ্রজিৎ বলে এক সহপাঠী আমার পাশেই বসত। তার খাতাপত্র বই একটু অগোছালো থাকত। হাতের লেখাটি যত-না খারাপ ছিল, খাতাটি তার চেয়ে বেশি কাটাকুটি করে, কালি ফেলে, মলাট ছিঁড়ে, কাগজ কুঁচকে একটা অদ্ভুত দর্শন করে রাখত। ওর নিজের চেহারা ছবিতেও এমন ঈশারা থাকত। জামায় কালির দাগ, প্যান্ট থেকে অর্দ্ধেক গোঁজা বেরিয়ে পড়েছে, জুতোয় কালি নেই, ফিতে খোলা। সব মিলিয়ে এলোমেলো এই ছেলেটিকে সুকুমার বর্ণিত দাশুর সাথে তুলনা করা যেত। একদিন ক্লাসে এন.এন.এস. স্যার পড়াচ্ছেন। কিছু একটা লিখতে দিয়েছিলেন। সবাই খাতা জমা দিয়েছি। স্যার একে একে দেখছেন আর মন্তব্য করছেন। শুভ্রজিৎ-এর খাতাটি, মরা-ইঁদুর ধরেছেন এমন মুখ করে তুলে বললেন, “এটা কি? এমন খাতা দিবি তো, ছুঁড়ে ফেলে দেব”। বলে সত্যিই মাটিতে ফেলে দিলেন। শুভ্রজিৎ অম্লান মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ছুঁড়ে ফেললে, আবার কুড়িয়ে নিয়ে আসব”। এই বলে একহাতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে গিয়ে খাতাটি মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এল। আমরা প্রত্যেকেই যখন মোটামুটি ধোপদুরস্ত হয়ে স্কুলে যেতাম, এমন কিছু নিশ্চই ছিল যা শুভ্রজিৎ কে অমন আলুথালু করে রাখত। সে বয়সে অতটা বোঝা বা জানার উপায় ছিল না।

বীশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য বলে একজন অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন। দীর্ঘদেহী এই মানুষটা অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন। খানিক আপনভোলা বিজ্ঞানীর মতো ছিল তাঁর ব্যবহার। একটি কাল্পনিক ছাত্রের গল্প তিনি খুব শোনাতেন, মূলতঃ আমাদের সেই ছাত্রটির সাথে তুলনা করতেই ছিল সেই গল্পের আয়োজন। তিনটি বিষয়ে পরীক্ষাতে ছাত্রটি একশোর মধ্যে যথাক্রমে শূণ্য শূণ্য এবং ছয় পেয়েছে। অথচ খুব আনন্দের সাথে নাচতে নাচতে “আমি শূণ্য শূণ্য ছয় পেয়েছি” বলে বাড়ি ফেরে। ছাত্রটির নম্বর সম্পর্কে কোন বোধ তৈরি হয়নি। ওই সময় আনন্দবাজার পত্রিকাতে সাপ্তাহিক শব্দজব্দ বা ক্রসওয়ার্ড বেরত। আর সঠিক জবাব দিয়ে চিঠি দিলে, ওরা পরবর্তী সপ্তাহে প্রথম কয়েকটি প্ররকের নাম ছাপাতেন। ওই সময় ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখবার দূরন্ত বাসনা ছিল। সঠিক উত্তর দেবার জন্য, মাঝেমাঝেই আমার নাম ছাপা হত। পড়াশুনায় ভালো হলে স্যারেদের কাছে আসা যায়। আমার বেলায় তা খুব একটা খাটেনি। লক্ষ্য করলাম বি.বি. স্যারও শব্দজব্দ করেন। ওই সূত্রে আমাদের মধ্যে কিছুটা ভাব হয়েছিল। অনেকবার আটকে যাওয়া শব্দের সমাধান ওনার কাছ থেকে জেনে নিতাম।

এইসবই খুব অকিঞ্চিৎকর অভিজ্ঞতা। পাঠকের কোন উপকারে আসবে না। ফিরে দেখার মধ্যে একটা অনুরণন হয়, যা কোথাও যেন ফেলে আসা সময় কে আবার ছুঁইয়ে দেয়।

বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৬

বর্ষা দিনে

পশ্চিম পাড়ার ঝাঁকড়া কদম গাছটার নিচে বৃষ্টি অপেক্ষা করত। ছাতা খোলার অবসর নেই, ঝমঝম ঝমঝম। আর যেই বাঁক ঘুরে ব্যাঙ্কে-র মোড় পার হলাম, কোথায় কি? খটখট রোদে চারিদিক ঝকঝকে। অথচ ততক্ষণে অনেকেরেই পোশাকে জলছাপ, জুতো সপসপ। মনের কোণে রেইনি-ডের ইচ্ছের বাতিরা জ্বলতে শুরু করেছে। কিন্তু রেইনি-ডে হত না। স্কুলের খাতায় একটা নিয়ম ছিল, একটা নির্দিষ্ট শতাংশ অনুপস্থিতি হলে, তবেই নাকি রেইনি-ডে দেওয়া যায়। ব্যাস ওইখানেই আমরা মাত। আমাদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ছাত্র আশ্রমে থাকে। তাই বৃষ্টি হোক বা জলোচ্ছাস, তাদের তো স্কুল পৌঁছান আটকায় না, কারণ তারা স্কুলের মধ্যেই থাকে। বিভিন্ন ক্লাসে বাংলা বা ইংরাজিতে রচনা লিখেছি রেইনি-ডে, তবে পুরো স্কুলজীবনে একবারও  বৃষ্টিতে ক্লাস ছুটি হয়নি। আরেকবার তো এমন হল বেশির ভাগ ছেলে ভিজে সপসপে হয়ে এসে, ভাবল বুঝি অন্ততঃ তারা ছুটি পেয়ে যাবে। কয়েকজন তো, নিজে থেকে কলের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজিয়ে নিল শরীর। ও বাবা! মহারাজ আশ্রম থেকে প্রত্যেকের জন্য শুকনো পোশাক আনিয়ে দিলেন। আমাদের ছুটি পাওয়ার ইচ্ছেগুলো ভিজে গলে ধুয়ে গেল।


বৃষ্টিদিন নানা অনুষঙ্গে ধরা দিত কৈশোরের দিনগুলোতে। ঝাঁকড়া হয়ে আসা কদমের ডাল আর নাগকেশরের গভীর কেশর সমৃদ্ধ বর্ষাবেলা আমাদের নতুন করে সিক্ত করত প্রতি বছর। টিফিনের সময় কদমের ফুল নিয়ে ফুটবল খেলা। হাতে পায়ে কদমের রেণু লেগে থাকত বুঝি। একদিন ঝপসা হয়ে আসা বৃষ্টিদিনে আপাদমস্তক বর্ষাতিতে ঢেকে চলেছি। পায়ে পায়ে জল ছপছপ। পাশ দিয়ে এক রিক্সা বোঝাই কিশোরীর দল। আমাদের লাগোয়া স্কুল ভবনাথের ছাত্রী সব। আমায় অমন বৃষ্টি-একা দেখে কেমন অকারণ হেসে ওঠে। সময়ের প্রলেপের ওপার থেকে সেই মুখগুলির কোনটাই মনে নেই। তবে রাস্তায় জল মেখে চলা বালককে দেখে কেন অমন হাস্যস্পদ মনে হয়েছিল, জানার উপায় নেই।


প্রত্যেক ক্লাসে বড়বড় নারকেল কাঠির এক জোড়া ঝাঁটা রাখা থাকত। আর পালা করে আমাদের দায়িত্ব পড়ত। সকালে দুজন আর স্কুল ছুটির পর দুজন। বেশ মজাই লাগত। বেঞ্চ সরিয়ে সরিয়ে ঝাঁট দিতে। একটা গুরুদায়িত্ব পড়েছে এমন ভাব। কখনও এদিক ওদিক কিছু ময়লা পরে থাকলে, দায়িত্ব প্রাপ্ত ছাত্রদের তলব করা হত। সেও ছিল বেশ ভয়ের ব্যপার।


ক্রমে আমাদের নিম্ন বুনিয়াদীর সময় ফুরিয়ে আসতে আরম্ভ করল। শুনলাম, আমরা সিক্সে উঠলে অন্য স্কুলে যাবো। সেখানে অন্য মাস্টারমশাই। তাদের সম্পর্কে অনেক রকম গা ছমছমে কথা ভেসে আসত। ‘মাঠের স্কুল’ আর ‘হাই স্কুল’, দুরকম নাম শুনলাম। সেগুলো কেন, কি জন্য বুঝিনি। তবে আমার যেসব সহপাঠীদের অভিভাবকরা, বিশেষ করে মায়েরা নিয়মিত স্কুলে আসতেন, তাঁরা জানতেন। আমায় সেই কোন কালে বাবা স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। শুরুতে কয়েকদিন বাবা নিয়ে আসতেন, ক্রমে হাত বদল হয়ে গেল। মনে আছে শঙ্করদা বলে একজন আমায় পৌঁছে দেওয়া নেওয়া করতেন। তাই মাঠের স্কুল না হাইস্কুল, কোনটা আখেরে ভালো হবে, বোঝার উপায় ছিলনা। আজও জানিনা এই দুই স্কুলে ছেলেদের বিভাজনের কি নিয়ম ছিল। আমার ঠাঁই হল, জুনিয়ার হাই স্কুলে। যা মাঠের স্কুল বলে বিখ্যাত। তার কারণ, স্কুল সংলগ্ন বিরাট মাঠ। সেখানে আবার খেলা দেখার জন্য গ্যালারির ব্যবস্থাও আছে। এই মাঠে নাকি জেলার খেলাও হয়। তখনকার দিনের কলকাতা মাঠের বেশ কয়েকজন ফুটবলারের খড়দহ রহড়া অঞ্চলে বাড়ি ছিল। তাঁরা অনেকেই এই মাঠে নিয়মিত অনুশীলন করতেন। ওই বয়সে তারকা ফুটবলারদের দেখতে পাওয়া যেন পরম প্রাপ্তি।


ফুটবলপ্রমী বন্ধুরা মাঠের-স্কুলে এসে যেন প্রাণ পেল। এখন বুঝতে পারি, অমন সুন্দর মাঠওয়ালা স্কুল খুব কম জনের ভাগ্যেই জোটে। ফুটবলের সাথে বৃষ্টির যোগ চিরন্তন। কাদা মাঠে বলের সাথে সড়াৎ করে পিছলে যাওয়া, তারপর আর চিনতে না পারা কে কোন জন। আমার যেন মাঠের গ্যালারিটাই বেশি পছন্দ। ওখানে বসেই খেলা দেখতাম। গোল হলে চিৎকার করে গলা ফাটাতাম, মাঠে খুব কমই নামতাম। একমাত্র যখন ওদের খেলোয়াড় কম পড়ত, টেনে এনে গোলকিপার করে দাঁড় করিয়ে দিত।

গোলপোস্টের সুরক্ষার চেয়ে যেন আমার নিজের লুকিয়ে থাকাটাই বড়। যারা রক্ষণার্ধে দাঁড়িয়ে, তারাই গোল বাঁচানোর যাবতীয় কারসাজি করত। আমি কতকটা সাক্ষীগোপাল হয়ে, পুরো খেলাটা দেখতাম। এমনি করে গোটা জীবনে খানিক দূর থেকে খেলা দেখার একটা অভ্যেস কেমন করে তৈরি হয়ে গেল। সেখানে আমি যেন আমি নই, মাঠে ছুটোছুটি করা কোন তৃতীয় পক্ষ। গ্যালারি তে বসে, নিজেরই খেলা দেখছি। সে আমার থেকে বিযুক্ত হয়ে অন্যকেউ।

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০১৬

উৎসব

শ্রীরামকৃষ্ণের নামাঙ্কিত স্কুল। পড়াশুনার সাথে সাথে চিনতে শিখলাম স্বামীজী, মা সারদা, ভগনি নিবেদিতা, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, লাটু মহারাজ থেকে রামকৃষ্ণানন্দজী আরও মনীষীদের। বাংলা অঙ্ক ইংরাজীর সাথে আরও একটা বিষয় আমাদের আগাগোড়া পড়ানো হত, তা হল ভারতীয় সংস্কৃতি। সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বামীজীর কথা, জীবনীর পাশে পাশে উপনিষদের গল্প, গীতার শ্লোক, শঙ্করাচার্য্যের মোহমুদ্গর ইত্যাদি নানা বিষয় পড়তে হত। কতক বুঝে বা না বুঝে সেই সব কথার কিছু কিছু মনে ভেতর গেঁথে দিয়েছিল, যা পরিণত বয়সে চলার পথে আলো দেখায়। ছেলেবেলায় এই বিষয়টিকে অন্য পড়ার বিষয় হিসেবেই দেখেছি।  আর পাঁচটা স্কুলের থেকে আমাদের স্কুলের পরিবেশ নিঃসন্দেহে আলাদা। গাছগাছালিতে ঘেরা আশ্রমিক তপোবন যেন, গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীরা চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ ক্লাশ নেন তো কেউ পুজো করেন, তো কেউ অফিসের দেখাশোনা করেন। আমাদের বেড়ে ওঠা একটা অন্য আবহে। তবে সেখানে খুব বেশি ধর্মচর্চা হয়েছে, বলে কখনও মনে হয়নি। আমাদের মন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের বিগ্রহের সাথে যীশুর ছবি, কাবার ছবি, বুদ্ধদেবের ছবি একই শ্রদ্ধায় পূজিত হত। আমাদের সাথে কয়েকজন অন্য ধর্মাবলম্বী সহপাঠিও পড়ত। ওই সময় তফাত বোঝার মতো মন ছিল না, বা আমাদের কখনও তফাত বোঝানোও হয়নি। যেমন মনে আছে শিবুদার কথা। নিম্নবুনিয়াদীর সহ প্রধান শিক্ষক। খুব বড় বাড়ির ছেলে। সংসার করেননি। স্কুলের ছেলেদের নিয়েই জীবন কাটালেন। শিবুদা বলতেন, "হয়তো তোদের বাবার ক্ষমতা আছে দামী কাপড়ের জামা কিনে দেবার, কিন্তু আমার আশ্রমের ছেলেদের কে দেবে?" তাই মোটা কাপড়ের পোষাক বরাদ্দ ছিল, আমাদের সকলের জন্যই।

শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি ফাল্গুন মাসে। ফি বছর ওই দিনটা ঘিরে আমাদের স্কুলে হত এক সপ্তাহব্যপী অনুষ্ঠান। মূল অনুষ্ঠানটা হত আমাদের নিম্নবুনিয়াদী বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে। পুরো মাঠ ঘিরে তৈরি হত প্যান্ডেল। যখন সেই প্যান্ডেল বাঁধার বাঁশ পড়তে আরম্ভ করত, আমাদের মনটা খুশিতে লাফিয়ে উঠত। নির্মীয়মান পান্ডেলের বাঁশ ধরে ঝুল খাওয়া ছিল পরম প্রাপ্তি। আর যারা ছিল আরেকটু ডাকাবুকো, তরতর করে এডাল ওডাল করে মগডালে উঠে যেত। প্রতিদিনের অনুষ্ঠানে একটি করে যাত্রা ছিল বাঁধা। আশ্রমের ছেলেরা একদিন করত, স্যারেরা করতেন একদিন, বাইরের প্রতিষ্ঠিত দলও আসত তাদের পালা নিয়ে। যারা পার্ট করত, অনুষ্ঠানের প্রায় একমাস আগে থেকে তাদের মহড়া চলত। কেমন ভিণগ্রহের প্রাণী বলে মনে হত। গোবিন্দ বলে একটি ছেলের কথা মনে পড়ে। আশ্রমে থাকত। আমাদের শ্রেণীতে পড়লেও, চেহারায় বেশ বড়সড় ছিল। ও একবার বোধহয় হিরণ্যকশিপু বা রাবণ হয়েছিল। টিফিন পিরিয়ডে মাঝে মাঝে চোখের কসরত আর অট্টহাসি সহ সংলাপ বলত। আমি তো চিরকেলে হাঁ-করা। সবকিছুতেই বিষ্ময়ে হতবাক হতাম। বিশেষ করে গোবিন্দকে যখন রাজপোশাকে মঞ্চে দেখলাম, কি বলব, বড় হয়ে ঠিক হিরণ্যকশিপু বা রাবণ হব বলে ঠিক করে ফেলেছিলাম।  দিন্দা স্যার কে মঞ্চে দেখার কৌতুহল ছিল খুব।

এই সপ্তাহটি আমাদের উৎসবের মেজাজ। উৎসব শব্দটি আমাদের বাল্য জীবনে এই অনুষ্ঠান ঘিরে আবর্তিত হত। পরে কথার মধ্যে, কোন বিশেষ আনন্দের অনুষঙ্গেও আমরা উৎসব বা শুধু উৎ শব্দটি ব্যবহার করে আমোদ পেতাম। উৎসব শুরু হত, এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে। এই মিছিলে যোগ দেবার জন্য আমাদের সাতসকালে স্কুলে এসে হাজির হতে হত। মিশেনের প্রতিটি বিভাগ থেকে সবাই অংশগ্রহন করত। সে শোভাযাত্রার বহর আর বাহার ছিল দেখবার মতো। আজও একই উদ্দীপনার সাথে শোভাযাত্রা বার হয়। যার মাথাটি প্রায় এক কিলোমিটার এগিয়ে গিয়েছে, অথচ শেষটুকু স্কুল প্রাঙ্গন ছাড়েনি। আমাদের কাজ ছিল, ছোট ছোট প্লাকার্ডে মহাপুরুষদের বাণী লিখে আনা। আর শোভাযাত্রায় সেই প্লাকার্ডটি বয়ে নিয়ে যেতে হত। যারা গান গাইত, তাদের জায়গা হত গানের দলের সাথে। কেউ কেউ স্বামীজী, শ্রীরামকৃষ্ণ, বা রাম লক্ষণ ইত্যাদি বহু মনীষীদের মতো সেজে গুজে রথে চড়ে বসত। তাদের প্রতি শুরুতে প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা হত, তবে পরে নিজেদের আনন্দ বিচারে, ওদের জন্য কষ্টই হত। আমরা যেমন খুশি বন্ধুদের সাথে মজা করতে করতে পুরো রাস্তা ঘুরতাম, ওরা বেচারা কাঠের পুতুলটি হয়ে ধরাচূড়া পরে বসে থাকত।

ওই সময়ে খুব বেশি বন্ধুরা গাড়ি চড়ে আসত না। স্কুলের দুটি বড় বাস ছিল, একটি টাটা কোম্পানীর অন্যটি অশোক লেল্যান্ড। যারা বাসে করে যাতায়াত করত, তাদের কাছে ওই বাসের সময়টি ছিল আরেক প্রস্থ আনন্দপীঠ। আমার কখনও সুযোগ হয়নি বাসে চড়ার। পথে যেতে কখনও স্কুলের নামাঙ্কিত বাসগুলোর দেখা পেলে, কেন জানিনা খুব রোমাঞ্চ হত। একটি লাল সাদা রঙ করা গোল মতো গাড়ি চড়ে একটি ছেলেকে আসতে দেখতাম। সম্ভবত ও তখন একাই অমন ব্যক্তিগত গাড়ি চড়ে আসত। আমাদের চেয়ে ছোট। পরে জেনেছি, বিখ্যাত যাত্রাশিল্পী শান্তিগোপালের ছেলে। শান্তিগোপাল কয়েকবার আমাদের উৎসব প্রাঙ্গনে পালাও করেছিলেন। মিলন স্যার গোঁফ কেটে, কোন স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করে ছিলেন। উৎসব শেষে তাঁকে গোঁফ ছাড়া গ্রহন করতে আমাদের বেশ মজা লাগত। বিরাট শোভাযাত্রায় আরেকটি মনে রাখার মত দৃশ্য ছিল, কবিদত্ত স্যারের ছবি তোলা। পুরো শোভাযাত্রাটির বিভিন্ন মুহুর্ত তাঁর ক্যামেরা বন্দী হয়ে থাকত। আর সে জন্য তিনি কখনও রাস্তার পাশে কোন গাছে চড়ছেন কখনওবা কারো বাড়ির ছাদে। শীর্ণকায় মানুষটির এই ছুটে ছুটে জায়গা বদল করাও আমাদের মনের খাতায় চির বন্দী হয়ে রয়েছে। এমন হাতে হাতে তখন ক্যামেরা ছিলনা, তার এই পরিশ্রম করে ছবি তোলার ছবি, কেউ তুলে রাখিনি।

সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০১৬

লাস্ট বেঞ্চ

বিরাট বিরাট মাঠ আর বড় বড় আম কাঁঠালের ছায়ায় মোড়া, এক স্বপ্নের প্রাঙ্গনের নাম, স্কুল। সেই সময় ভয় করত। হয়তো এখনও করে। স্কুলে পৌঁছানোর নির্দেশ-লিখন প্রায় তিন চার কিলোমিটার দূরে দূরে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে টাঙানো থাকত। আজও আছে। সেই সময় ছিল ভোরের স্কুল। শুরুতে বাবার হাত ধরে এসেছি। তারপর হাত বদল হতে হতে, একা একা সহজ সাইকেলে। কোন এক কুয়াশা মোড়া শীতের সকালে জীবনের এই অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল, কারণ তখন জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ছিল পড়াশুনার বৎসর। বেশিরভাগ শিশুরই স্কুলে যাওয়ার আগে ও পরে এক উত্তেজনা ও অনীহা তৈরী হয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভোরের আলো আধাঁরিতে যখন প্রথম রাস্তার মোড়ে স্কুলের নাম লেখা বড় নির্দেশ-লিখন চোখে পড়ত, বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠত এক অজানা আশঙ্কায়। না জানি আজ আবার কি আছে অপেক্ষায়? ক্রমে ক্রমে স্কুল কাছে আসতে থাকে, আর সেই ধুকপুকানিও বাড়তে থাকে।

সেই সময় শীত আসত মরসুমি ফুলের হাত ধরে। স্কুলের প্রধান ফটক পার করার পর, চোখে ধাঁধা লাগানোর মতো বড় বড় ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকায় আলো হয়ে থাকত। এত আলোতেও কিন্তু মনের সেই ধুকপুকানিটা যেত না। শুরুতে সরাসরি মন্দির প্রাঙ্গন। সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের মর্মর মূর্তি। খুব চট করে একটা প্রণাম ঠুকে স্কুলের পথে পারি। বাঁদিকে সদর আপিস, মঙ্কস কোয়ার্টার, টেলারিং, ডাইনে বিবেকানন্দ হল, রাজকুমার পাঠাগার পার হয়ে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌহদ্দি। সেখানে এক দৌড় সমান মাঠ। ঊৎসব মাঠ। সেখানে আশৈশবের ধূলো ছড়ানো। লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে চলার সহজ দিনগুলো। একপাশে প্রাক্ প্রাথমিকের ঘর। উঁকি দিতাম। আমাদের থেকেও ছোট ছোট ছেলেগুলো একরাশ পুতুল সাজানো ঘরে। কখনও ঘুমোনোর ক্লাসও করত। চোখ পিটপিট করে ফাঁকিও দিত। যেমন আমরা ধ্যানের ক্লাস ফাঁকি দিতাম। কেউ কেউ ঢুলেও পড়ত।

আশ্রম আর বাহির। দুটো শব্দ কে যেন দেগে দিল। কালো বোর্ড থেকে মনের ভেতর, সবখানে। একটা বড় সংখ্যার অনাথ শিশুদের আশ্রয়, আমাদের স্কুল, সেটা বোধের ভেতর আসতে সময় লেগেছে। কেন স্কুলের নাম ‘বালকাশ্রম’, সেই সময় অনুধাবনের ক্ষমতা ছিলনা। ক্লাস মনিটর যখনই দুষ্ট ছেলেদের শাসন করেছে, বা কোন খেলাধূলা বা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার সময় হয়েছে, আশ্রম আর বাহির দুটো দল তৈরি হয়ে গেছে। অবচেতনেই আমাদের মনে গেঁথে গেল, আমরা বাহিরের ছেলে আর যারা আশ্রমে থাকে তারা ঘরের ছেলে। ওই বয়সেই আশ্রমের ছেলেদের দৃশ্যতঃ তফাত চোখে পড়ত। পোশাক পরিচ্ছেদ, বইখাতা, পেন্সিল সব কিছুই যেন স্বতন্ত্র। অনেক পরে বুঝেছি আমরা স্কুলের জন্য তৈরি হতাম মায়ের আদরে। ওদের স্কুলে আসার পিছনে সেই যত্নমাখা স্নেহময়ীর হাত থাকত না।

প্রথম স্কুল, প্রথম দিন ব্যক্তি মননে ছাপ রেখে যায়। যদিও বালকাশ্রমের আগে আমার আরেকটি স্কুলের অভিজ্ঞতা ছিল। সে গল্পও অতি চমৎকার। যথা সময় সেই ঝুলি খোলা হবে। রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রমের প্রথম দিন, মহারাজ অমরশঙ্করের ঘরে। এক অদ্ভুত দর্শন ঘড়ি। দেয়াল জুড়ে একটি শিশুর মুখ। ঘড়ির কাঁটার সাথে তার চোখ নড়ে, সম্ভবতঃ জিভ নড়ে। সৌম্য দর্শন মহারাজ। প্রথম এমন পোশাক পরা কোন সন্ন্যাসীর সাথে আলাপ হল। আমাদের প্রধান শিক্ষক। তাঁর কক্ষটিতে ছড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলি স্বামীজীর ছবি। আজও মনে পড়ে, জিজ্ঞেস করেছিলেন, কতগুলো স্বমীজীর ছবি? গুণে বলেছি, কয়েকটি হয়তো বাদ গিয়েছিল, এখন আর মনে নেই। স্থান হল দ্বিতীয় শ্রেণীর খ বিভাগে। দোতলায় উঠে, লম্বা বারান্দা হয়ে শেষ দিকে। প্রথম ঘরটি ক-বিভাগ, দ্বিতীয়টি খ-বিভাগ। সেদিন ভাস্করও ভর্তি হল। ও বসল গ-বিভাগে। ক্লাস তখন শুরু হয়ে গেছিল। আমি নাকি দেবাশিসের পাশে গিয়ে বসেছিলাম।

সেই সময়কার কয়েকজন শিক্ষককে আজও মনে পড়ে। বিনয় স্যার। খালি পায়ে আসতেন। বয়স্ক, ময়লা সাদামাটা ধুতি পাঞ্জাবী। বোর্ড মোছার জন্য, বোধহয় ডাস্টারের শুধু কাপড় ব্যবহার করতেন। বাংলা পড়াতেন। কি পড়িয়েছিলেন মনে নেই। তবে তাঁর মলিন চেহারার নিরাভরণ বিমর্ষ রূপটি কেন জানিনা চিরস্থায়ী হয়ে রইল। আরেকজন বয়স্ক শিক্ষক ছিলেন, বন্ধুস্যার। নাম জানিনা, এই নামেই পরিচিত ছিলেন। তবে বন্ধুত্বের কোন লেশ উপলব্ধি করতে পারিনি। কোন এক অজগর সাপের, আর ডাইনি বুড়ির ঘরে আটকে রাখার ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর অনুশাসনের ভয় দেখাতেন। মাটির কাজের ক্লাস নিয়েছেন। আর প্রার্থনার সময়, কে কে চোখ খুলে রেখেছে, নিজে চোখখুলে সেই নিয়মভাঙা ছেলেদের পাহারা দিতেন।

রামু আর মলয় দুইজন আশ্রম বালকের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। রামুর গালে একটা বড় পোড়া দাগ ছিল। খুব ছোটবেলার কোন ভয়ঙ্কর দিনের স্মৃতি চিহ্নরূপে। অনেকে ওকে মুখপোড়াও বলত। আমার শুনতে ভালো লাগত না। ও তো ইচ্ছে করে পোড়ায়নি। আশ্রমের ছেলেরা আমাদের চেয়ে অনেক স্বাবলম্বী। বাবা মা ছাড়া একা একা সব করে। প্রতিদিন স্কুলে আসার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, পড়া তৈরি করে, বিছানা গোছায় আরো কত কি? গরমের সময় মলয় ছোট ছোট আমের কুশি নিয়ে আসত। আর পিছনের বেঞ্চে বসে ব্লেড দিয়ে সেই আম ছোলা হত। ওদের সাথে নুনও থাকত। সেই নুন সহযোগে কষটে আমের স্বাদ স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দিত।

নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ে এক লহমায় যিনি মন জিতে নিয়েছিলেন, তিনি দিন্দা স্যার। এই নামেই পরিচিত ছিলেন, প্রথম নামটি জানা হয়নি। তাঁর গল্পের ক্লাসে মোহ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কপালকুন্ডলা গল্পে, সেই যখন নবকুমার কে ফেলে রেখে, নৌকা চলে গেল। নবকুমার হাঁটু জলে দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে, “মাঝি নৌকা ভিড়াও”, কেউ সাড়া দেয় না। দিন্দা স্যারের সেই ডাক আজও মনের ভেতর ডুবে রয়েছে। ছেলেবেলায় প্রথম বঙ্কিম পড়ার নেশায বীজ খুব সন্তর্পনে বপন করে দিয়েছিলেন। পরে দিন্দা স্যারকে স্কুলের নানা নাটক যাত্রায় অভিনয় করতে দেখেছি। মনে মনে তাঁকে দেখার একটা আলাদা আকাঙ্খা তৈরি হয়েছিল।

অঙ্ক করাতেন শ্রীধর স্যার। এছাড়া পরের ক্লাসে বৈদ্যনাথ স্যার, বা বৃত্তি ক্লাসে গাঙ্গুলি স্যারের কাছেও অঙ্ক করেছি। বৈদ্যনাথ স্যারের কাছে তৃতীয় শ্রেণীতে অঙ্ক করলাম। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল ঘোরানো, ঝুলপি ধরে উল্টোদিকে টান আর মাটিতে বসিয়ে রাখার শাস্তি। আর সেই অমোঘ বাণী, “খেয়ে পারো, না খেয়ে পারো, ঘুমিয়ে পারো, না ঘুমিয়ে পারো, আমার পড়া চাই”। শুরু হল স্কুলের সাথে নানাবিধ ভয়ের অনুসঙ্গ।

আরও একটি ভয় সেই নয় বৎসরের শিশু মনে গেঁথে গেল। একেবার অন্যরকম ভয়। শিক্ষকের নাম করতে চাই না, কারণ তিনি শিক্ষক। ভয়ে হোক বা ভক্তিতে তাঁর পড়ানো বিষয়ে হঠাৎ করেই ভালো নম্বর পেতে শুরু করি। তিনি মাঝে মাঝে বাড়িতেও আসতেন। নিয়মিত গৃহশিক্ষকরূপে নয়, তবে আসতেন। মনে আছে, ছাদে মাদুর পেতে বসে আছি। নানা কথায় আমার প্যান্টের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিতেন আর বলতেন, “তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ওঠ, আমরা বন্ধু হয়ে যাবো”। কেমন লজ্জায় ভয়ে ঘেণ্ণায় সিঁটিয়ে যেতাম। সেই সময় কাউকে বলতে পারিনি। অনেক পরে অন্য বন্ধুদের কাছ থেকেও এক অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরেছি।

ক্রমে স্কুলজীবন এক ভয়জীবনে পরিণত হল। প্রায় প্রতিটি শিক্ষক নিজের নিজের মত করে ভীতিপ্রদ। ক্লাসে বহু স্যারই, চক ডাস্টারের সাথে বেত নিয়ে আসতেন। নিয়মানুবর্তিতা শেখাতে গিয়ে কত যে বেতের বাড়ি, কিল চড়, ঘুঁষি আসেপাশে পড়ছে তার লেখাজোকা নেই। নিজের গায়ে না পড়লেও, সেই শব্দে কাঁটা হয়ে থাকতাম সর্বদা। কি জানি, কোন পান থেকে চুন খসে পড়ল?

ছবি আঁকার ক্লাস নিতেন কবিদত্ত স্যার। স্কুল ছেড়ে আসার অনেক পর তাঁর সাথে অন্য ভাবে আলাপ হয়েছিল, একবার বাড়িতেও গেছিলাম। সারা বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাঁর শিল্পকীর্তি, আমায় অবাক করেছিল। তবে একটু খ্যাপাটে স্যারটি যেন স্কুলের চৌহদ্দিতে বড় বেমানান ছিলেন। তবে মুগ্ধ হতাম ওনার ছবি আঁকার নৈপুণ্য দেখে। কত অনায়াসে বোর্ড জুড়ে ক্লাস ওয়ার্ক দিতেন। তখন রাস্তার দেওয়াল জুড়ে নানা রকম রাজনৈতিক পোস্টার আঁকা হত। এখনকার মতো ফ্লেক্স নির্ভর ছিলনা। স্টেশন সংলগ্ন একটা দেওয়াল জোড়া বড় ছবি ছিল। একদিন আবিস্কার করলাম আমাদের কবিদত্ত স্যার সেই পোস্টারটি আঁকছেন। খুব উৎকৃষ্ট শিল্পসৃষ্টি হয়তো ছিল না, তবে সেই দিনের পর থেকে স্যার সম্বন্ধে একটু খারাপ ধারনা তৈরি হয়ে গেল। এ বাবা! আমাদের স্যার রাজনৈতিক ছবি আঁকেন? পরে বুঝেছি, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা। স্কুল-শিক্ষকের গন্ডীর বাইরের একটা পরিচিতি।

এমনি করে নানা মানুষ নানা ভাবে ছাপ ফেলে যেতে লাগলেন, আমাদের জীবনে। নীলমণি স্যার, প্রণয় স্যার, পাল স্যার। গানের স্যার ছিলেন দুজন। অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় আমাদের রচনা লিখিয়ে মুখস্থ করাতেন নীলমণি স্যার। বিশেষ করে সেই সময় মুখস্থ করা শরৎকালের কথা হয়তো আজও মগজের কুলুঙ্গীতে পাওয়া যাবে। তবে মজার ব্যাপার হল, কিছুদিন পর, আবিস্কার করলাম যে, ওনার ওই লেখাগুলো উঁচুক্লাসের একটা বই থেকে হুবহু অনুকরণ করা। যে স্যারকে তাঁর জ্ঞান আর ভাষার পরিধির জন্য একটা বিশেষ আসনে বসিয়েছিলাম, খুব সহজেই তিনি হয়ে গেলেন অত্যন্ত সাধারন।

তৃতীয় শেণীর ক্লাস হত, একটা টিনের শেড ওয়ালা টানা বারান্দার বাড়িতে। বৃষ্টির সময়, টিনের চালে এক অলৌকিক শব্দ হত। আজও সেই ঝমঝম শব্দ কানে লেগে আছে। তার এক পাশে ছিল পাল স্যারের ঘর। রোগা শ্যাম বর্ণ মানুষটি কি পড়াতেন মনে নেই, তবে ক্লাসে আসতেন বোগনভেলিয়ার কাঁটাযুক্ত ডাল ভেঙে। এই বোগনভেলিয়া গাছটি ছিল বারান্দার সিঁড়ির পাশে। টিফিনের সময়, দেবাশিসের সাথে এই গাছের নিচে বসে টিফিন খেতাম। একবার মনে আছে, দেবাশিস ওর পায়ে স্কেলের দাগ দেখায়। বাড়িতে বাবার কাছে মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা শোনায়। সময়টা কেমন অদ্ভুত ছিল। স্কুলে, বাড়িতে মার খেতে খেতে আমরা মানুষ হবার চেষ্টা করতাম। পরিণতি কতটা ফলপ্রসু হয়েছে, কে জানে? এই তৃতীয় শ্রেণীতে আরেকটি বন্ধুর কথা মনে পড়ে, নাম কৃষ্ণগোপাল। ভালো অঙ্ক করতে পারত। কিন্তু অনেকদিন স্কুলে আসতে পারত না, অসুস্থতার জন্য। ক্রমে পিছিয়ে পড়তে লাগল। বহু অঙ্ক করা বাকি থেকে গেল। ওর কি হয়েছিল বুঝতাম না। একবার এলো, অনেক মোটা আর ফ্যাকাশে হয়ে। তারপর আর এল না। একদিন হঠাৎ স্কুল ছুটি হয়ে গেল, কৃষ্ণ নাকি আর নেই। খুব খারাপ লেগেছে। বেঞ্চে আমার পাশেই বসতো। এখন ফাঁকা হয়ে গেল।

প্রণয় স্যার আমায় নাম দিয়েছিলেন মাংসরুটি। কেন জানিনা, হয়তো টিফিনে মাংস রুটি নিয়ে যাবার জন্য। যদিও সে সুযোগ তখন ছিলনা। বাড়িতে আশ্রিত আত্মীয় নিয়ে অনেক ভীড়, তাদের সামলে মানির পক্ষে রুটি তরকারির বেশি কিছু দেবার সম্ভবনা ক্ষীণ। সব বিভাগের ভালো ছেলেদের নিয়ে একটা আলাদা বিভাগ তৈরি হয়, বৃত্তি পরীক্ষার জন্য। কিভাবে আমি সেই বিভাগে বসার সুযোগ পেয়ে গেলাম। অনেকগুলো নতুন বন্ধুদের সাথে আলাপ হল। পরবর্তিকালে বুঝেছি, এই বন্ধুরা ছিল স্কুলের প্রথম সারির ছাত্র।

স্কুল প্রাঙ্গনে ছিল একটা বড় সিমেন্ট নির্মিত স্লীপ আর লোহার বড় ঘূর্ণী। ক্লাসের ফাঁকে সেই দুটি খেলার অবলম্বন নিয়ে আমাদের হুড়োহুড়ির শেষ ছিলনা। সিমেন্টের স্লীপ চড়ে চড়ে বহু ছেলেদের প্যান্টের পিছনে ফেঁসে গিয়েছিল। আমারও হয়েছিল। তবে সেটা যখন বুঝলাম, তখন থেকে আর চড়তাম না। এক বছরের মধ্যে বারবার বাবার পক্ষে প্যান্টের যোগান দেওয়া সম্ভব ছিলনা। মানি ওই প্যান্টটাই রিফু করে দিয়েছিলেন, সেই বছরটা মেরামত করা প্যান্ট পরেই চালাতে হয়েছিল।

ব্লগ এবং বই পাওয়ার ঠিকানাঃ https://souravstory.com

 এখন থেকে ব্লগ সহ অন্যান্য সব খবর এবং বই পাওয়ার ঠিকানাঃ https://souravstory.com