শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১৬

রাজকুমার

রাজকুমার বাজারে কুলির কাজ করে। চেহারা বেশ ধারালো। বোঝা যায় গায়ের রঙ কোন কালে ফর্সা ছিল, রোদজলে পুড়ে এখন তামাটে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের জন্য হাত পা পেশল এবং সুগঠিত। গোবিন রাজকুমার কে দেখে আর অবাক হয়। ভোর বেলা বাজারের ধার ঘেঁষে আলু বোঝাই লরি এসে দাঁড়ায়। বড় বড় আলুর বস্তা লরির ওপর থেকে নামিয়ে দেয়। রাজকুমার সেই আলু বোঝাই বস্তাগুলো অবলীলায় পিঠে নিয়ে নেয়। একটা ফাঁকা বস্তা চাদরের মতন মাথা থেকে পিঠের ওপর পাতা থাকে। তার ওপর অমন ভারি ভারি বস্তাগুলো চাপিয়ে, কেমন হেঁটে চলে যায়। একটু কুঁজো হয়ে, দুই হাত মাথার ওপর দিয়ে বস্তার দুই কোণা আঁকড়িয়ে ধরা। এটুকুই অবলম্বন। তারপর বাজারের ভেতরে বিভিন্ন দোকানদারদের কাছে গিয়ে নামিয়ে রাখে। রাজকুমারকে ভোরবেলা মাল টানা ছাড়া অন্য সময়ে বড় একটা দেখতে পায়না গোবিন। মনে মনে ভাবে, এ নিশ্চই কোন শাপগ্রস্ত সত্যিকারের রাজকুমার। খুব গোপনে ছদ্মবেশে এখানে রয়েছে। না হলে এমন চেহারা আর আভিজাত্য নিয়ে, সে কি করে এমন সামান্য কাজ করে! রাজকুমার কে সে বড় একটা কারো সাথে গল্পগাছা করতে দেখে না। একমনে নিজের কাজ করে যায়। এক বস্তার পর দুই বস্তা, দুই থেকে তিন, এমন চলতেই থাকে।

গোবিনের বেয়াড়া ইচ্ছা, এই রাজকুমারের বাড়ি যাবে। বা ওর রাজপ্রাসাদ দেখবে। একবার পুষ্পহাটিতে গিয়ে এমন একটা বড় প্রাসাদের মতো বাড়ি দেখেছিল। বাড়ির পাঁচিল জায়গায় জায়গায় ধসে গেছে। রঙ উঠে গিয়ে দাঁত বেরোন চেহারা। বেশ কয়েকটা বট অশথ্থের চারা এদিক ওদিক দিয়ে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে। বাড়ির হাওদার মধ্যে এক বিশাল পুকুর। সেখানে একটা অল্প বয়সী মেয়ে বাসন মাজছিল। কে যেন বলেছিল, এদের পূর্বপুরুষ এই অঞ্চলের জমিদার ছিল। এখন অবস্থার বিপাকে পরে খাবি খাচ্ছে। শরিকি ভাগাভাগিতে বাড়ি মেরামত আর হয়না। যার কোথাও যাবার নেই, তারাই কোন মতে এই পোড়ো বাড়িতে ভুতের মতো টিঁকে আছে। গোবিন ভাবে, সে হিসেবে মেয়েটি রাজকুমারী। শাপগ্রস্ত হয়ে বাসন মেজে দিন গুজরান করছে। তেমনই দৃঢ় বিশ্বাস, বাজারের রাজকুমারেরও এমন কোন ইতিহাস আছে। কিন্তু রাজকুমারের সাথে আলাপ করার সুযোগ হয় না। সে কাজের বাইরে কারো সাথেই কথা বলেনা। হাসি ঠাট্টাও করেনা। কি করে যে কাছে ঘেঁষবে, বুঝে উঠতে পারে না।

সেদিন তেমন কাজ ছিল না, তাল ঠুকে রাজকুমারের পিছু নিল। একটু ভয় ভয় করছিল, যদি জানতে পেরে যায়! তবে রাজকুমারের একমনে রাস্তা চলা, তার কাজের মতোই। কোনদিকে তাকায় না। সোজা গড়গড়িয়ে হেঁটে যায়। এ রাস্তা সে রাস্তা পাড় হল। পথে জল ছিল, বাঁ ধারে পুকুর এল, ডান ধারে পুরোণ পোস্টাপিস, বাজার, স্কুল। এমন কতশত পথ ঘুরে শেষমেষ একটা পেল্লায় বাড়ির সামনে এসে থামল। সে বাড়ি যেমন মস্ত তার সদরও তেমন দশাসই। লোহার গেট পার হয়ে, ভেতরে বড় বড় গাছে ছাওয়া মোরাম বিছোনো রাস্তা। সেই নুড়ি পাড়িয়ে রাজকুমার গড়গড় করে ভেতর পানে হেঁটে চলে যায়। এই অবধি এসে, গোবিন থমকায়। এবার কি করবে? গেট দিয়ে, কি বলে ঢুকবে? একটু দূরে দাঁড়িয়ে সাতপাঁচ ভাবছিল, এমন সময় মাথায় পাগড়ি বাঁধা একটা লোক এল, হাতে তার তেল দিয়ে পাকানো একটা বাঁশের লাঠি। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। “আপনাকে ভেতরে তলব করেছে”। গোবিন এবারে সত্যি ভয় পেয়ে গেল। তবে কি ধরা পরে গেল? আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করে, “কে?” লোকটা জবাব দেয় না। ইঙ্গিতে সামনের দিকে দেখায়। গোবিন এবার মহা ফাঁপরে পড়ল। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। একবার ভাবে, টেনে দৌড় লাগাবে কি না? তারপর মনে হয়, কোন দোষ তো করেনি, শুধুশুধু পালাতে যাবে কেন? একটু আড়ষ্ট হয়েই ভেতরে ঢুকলো। বাইরে থেকে যতটা মনে হয়েছিল, বাড়িটা তার চেয়েও বড়। বিশাল বাগান। বাঁ দিকে একটা টানা বারান্দা সহ দুচালার লম্বা বাড়ি। অনেকটা কাছারি বাড়ির আদল। বাগানের ডান দিকে বিরাট প্রাসাদ। বোধহয় দোতলা। তবে উচ্চতায় অনায়াসে এখনকার চারতলার সমান। বড় বড় থাম আর নক্সাকাটা জাফরি। বাড়ি পুরোণ তবে ভাঙাচোরা নয়। বোঝা যাচ্ছে নিয়মিত পরিচর্যা হয়। আর সোজা তাকালে চোখে পড়ে সতত প্রবহবান গঙ্গা। সুন্দর বাঁধানো ঘাট। বড় বড় গাছেরা ছায়া নিয়ে ঘিরে রেখেছে। গোবিনের মন ভরে গেল। ইচ্ছে করছিল ওই ঘাটে গিয়ে দু দন্ড বসে। এদিকে পাগড়ি পড়া লোকটা, ওকে নিয়ে ওই ঘাটের কাছেই নিয়ে এল। সেখানে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পড়ে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। গোবিন কে রেখে সে আবার ফিরে গেল।

বৃদ্ধ গৌরবর্ণ। সাদা পোশাকে সৌম্যসুন্দর লাগছে। ইশারায় বসতে বলে। গোবিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে পরে।  বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করেন,
- বাড়ি কোথায়?
- ডিমপুকুর।
- তা এখানে কি মনে করে?
- মানে, এই বেড়াতে বেড়াতে চলে এসেছি।
- ও বাবা এটা বেড়ানোর জায়গা জানতুম না তো?
- বেড়ানোর কি জায়গা লাগে না কি? আমার যে রাস্তায় যেতে ভালো লাগে, সেখানেই বেড়ানো হয়।
- বাঃ বেড়ে বললে তো।

দুচার কথায়, গোবিনের আড় ভাঙতে থাকে। এবার নিজে থেকে জিজ্ঞেস করে,

- এটা কি আপনার বাড়ি?
- না না, এখানে আমি চাকরি করি।
- এটা কি অফিস নাকি?
- না অফিস নয়, তবে মহিলাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। আমি এর সম্পাদক।
- এটা রাজবাড়ি নয়?
- রাজবাড়ি? তুমি তাই ভেবেছো নাকি? তবে এটা এক ধনীব্যক্তির সম্পত্তি ছিল ঠিক। এখন হাত বদল হয়ে ট্রাস্টের হাতে। হোমটা ট্রাস্ট-ই চালায়।
- খুব সুন্দর জায়গাটা। একটু ঘুরে দেখতে পারি?
- যা ঘোরার তো ঘুরেই ফেলেছো। এদিকটাতেই আসাযাওয়া করা যায়, ওই বাড়ির দিকে নিষেধ আছে।
- কেন?
- কেন আবার বললাম না, মেয়েদের হোম। পুরুষ মানুষদের ঢুকতে দেওয়া হয়না। তাই তোমায় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভেতরে নিয়ে এলাম। এতোগুলো মেয়ে এখানে থাকে, বুঝতেই পারছো। আমারও যাতায়াত ওই আপিস ঘর পর্যন্ত
- ও, আসলে আমি জানতাম না। তবে আমি একজন পুরুষ কে একটু আগে ঢুকতে দেখলাম।
কথাবর্তায় একটু সহজ হয় গোবিন। এবার মূল উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ করতে চায়। যদি রাজকুমারের ব্যাপারটা জানতে পারে।
- তুমি রাজকুমারের কথা বলছ? ও তো হোমে রান্না করে।
- রান্না করে?
- হ্যাঁ, সকালের রান্নাটা মাসি করে দিয়ে চলে যায়। বিকেলেরটা ও করবে। আবার কখনও মাসি ছুটিছাটা নিলে, তখন দুবেলাই করে।
- ও এটা ওর বাড়ি নয়?
- তুমি রাজকুমারকে চেন?
- না তেমন ভাবে নয়, তবে বাজারে দেখেছি।
- বাড়ি যে ওর কোথায়, ও নিজেই জানে না। খুব ছোটবেলায় এক বন্যায় ভেসে যাওয়া দলে ওকে পাওয়া যায়। মা বাপের খোঁজ মেলেনি। ওই দলের দুয়েকটা মেয়ের সাথে এই হোমে আসে। সেই থেকে রয়ে গেছে। তবে মেয়েদের হোমে তো জায়গা হবে না। আমার সাথে থাকে। ট্রাস্টের খাতায় নাম তুলে দিয়েছি। মাইনে পায়, কাজ করে। কখনও মালি, কখনও রাধুনী, কখনও দারোয়ান, ইস্ত্রিওয়ালা, এই সব।

গোবিনের হিসেব গুলিয়ে গেল। রাজপ্রাসাদ যে কোথাও একটা রয়েছে, তার সম্ভাবনা রয়েই গেল। রাজকুমার কোন একদিন নিশ্চই তার হদিশ পেয়ে যাবে। তখন গোবিনেরও শান্তি হবে। ঘাটের সিঁড়িতে বসে অস্তগামী সূর্য্যের রংবাহার দেখতে থাকে। নদীর জল, সোনালী হয়ে ওঠে। স্রোত ক্রমান্বয়ে দৌড়ে চলেছে। সেই দৌড়ে সামিল সবাই। বাড়ি ঘর, এই হোমের সমস্ত মেয়েরা, এই বৃদ্ধ সম্পাদক সবাই। শুধু রাজকুমার একা। তার বাড়ি, ঘুম, রাজ্যপাট কোনটাই নেই।

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬

শব্দ-গন্ধ

ডিমপুকুরে ভোর হতো কারাখানার ভোঁ-র সাথে। মানুষ ঘড়ি মিলিয়ে নিত। ওদিকে ফাঁড়িতেও একটা পেতলের পেটা ঘন্টা ঝোলানো। প্রতি ঘন্টায় একজন সেপাই গুণে গুণে হাতুড়ি মারত। অনেক দূর থেকে সেই ঘন্টা ধ্বনি ভেসে আসে। সকালের অপিসের ভাতের ঘ্রাণের সাথে জুড়ে থাকে ভোঁ-এর শব্দ। আর শীতের রাতে, আপাতঃ নিঝুম হওয়া পল্লীর বাতাসে রাত এগারোটা বা বারোটার লম্বা ঘন্টা ধ্বনি নীরবতাকেই যেন প্রলম্বিত করত। জুটমিলের ছিল বাড়বাড়ন্ত। তার শ্রমিক আর অফিসারদের ভিন্ন ভিন্ন আবাসন আর পল্লী। তাদের চরিত্র একেক রকম। ক্রমশঃ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ল চট শিল্প। একের পর এক মিলগুলো তে তালা লাগল। দিশেহারা মানুষ কেউ কেউ ছোটখাটো দোকান দিল। মুদি বা সাইকেল সারানো। কেউ দেশে ফিরে গেল, যাদের ফেরার উপায় নেই তারা গলায় দড়িও দিল। অপরাধ বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক নেতারা ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে নেমে পড়ল ঘোলা জলে মাছ ধরতে।

গোবিনের এসব ছোটবেলার কথা। এখনও বেশ মনে পড়ে, দূর্গাপূজার চেয়ে বিশ্বকর্মায় জাঁক ছিল বেশি। প্রতিটি কারখানার গেট খুলে দেওয়া হতো। বড়দের হাত ধরে অপার বিষ্ময়ে সেই বিশাল বিশাল গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করত। কত রকম চোখ-স্থির হওয়া যন্ত্র। কনভেয়ার বেল্ট। স্পিনিং মিল। এক আধটা লোহা আর রাসায়নিক কারখানাও ছিল। তাদের বড় বড় হপার, সেখান থেকে লম্বা বেল্টের লাইন চলে গেছে এক শেড থেকে অন্য শেডে। এর মধ্যে কোথাও প্যান্ডেল খাটিয়ে বিশ্বকর্মার অধিষ্ঠান। দুই দিক দিয়ে হয়তো বড় বড় বুলডোজারের ধাতব হাত দিয়ে মালা ঝোলানো আছে। পাশাপাশি কোম্পানিতে রেষারেষি চলত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে। কেউ টালিগঞ্জ থেকে শিল্পী নিয়ে এলেন তো অন্যজন ছুটলেন বম্বে। আর ছিল আকাশ ভরা ঘুড়ি। মন্ডপ সজ্জাতেও অনেক ঘুড়ি। সবকিছু ছাপিয়ে থাকত শ্রমজীবি মানুষের ঢল। যে যার সাধ্য মতো সাজায় নিজেকে, তারপর উৎসবের হাত ধরতে বাইরে আসে। সেখানে না আছে বিত্তের দম্ভ, না আছে প্রচুর্য্যের প্রতিযোগিতা। তাই, খুশি-ই এই উৎসব উদযাপনের প্রাথমিক শর্ত ।

সময় দাঁড়িয়ে থাকে না। সে চলতে থাকে তার নিজের তাগিদে। এক সময়কার এলাকা কাঁপানো মস্তান হঠাৎ করে বিয়ে করে আনল, এক শিক্ষিত সুন্দরী কে। তারপরে বদল ঘটল ধীরে ধীরে। এখন সে অটো চালায়, আর স্ত্রী স্কুলে পড়ান। পুরোণ কারখানার কঙ্কাল দাঁড়িয়ে থাকে পাশে তৈরি হয় নতুন উদ্যোগ। বিস্কুটের কারখানা, পাইপের কারখানা। সেখানে আবার নতুন করে শুরু হল কর্মযজ্ঞ। সকাল থেকে ঠিকা শ্রমিকদের লাইন পড়ে এই নতুন কারখানাগুলোর গেটে। একজন দুজন করে ফেরিওয়ালারা বসতে আরম্ভ করে। কেউ ছাতুর সরবত, কেউ চা, কেউ কচুরি, ডিম সেদ্ধ।

রাসায়নিক কারখানা থেকে মাঝে মাঝে ক্লোরিন গ্যাস বেরিয়ে আসত। তার উত্তেজক ঘ্রাণে নিঃশ্বাস নেওয়া ছিল ভারি মুশ্কিল। গাছের পাতাদের রাতারাতি হলুদ হয়ে মাটিতে ঝরে থাকতে দেখা গেছে। আসেপাশের জঙ্গল থেকে দিনের বেলাতেই শিয়ালরা বেরিয়ে এসে ডোবার জলে ডুবে রেহাই পেতে চাইছে। চিরশত্রু কুকুরদেরও এক দশা। তখন আর কেউ কাউকে তেড়ে যাচ্ছেনা। প্রাণের দায়ে একই সাথে ডোবার জলে। পরিবেশ বাঁচাতে মানুষ একত্রিত হয়েছে। আন্দোলন হয়, হৈচৈ, লেখালেখি। কয়েকদিন একটু ঠিক থাকে, তারপর আবার কোন একদিন টের পাওয়া যায় প্রবল গ্যাস ছেড়েছে। একদিন সেই কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ কারখানার গেটে একটা ত্রিপল খাটিয়ে কিছু শ্রমিকরা অবস্থান ধর্মঘট করতেন। শুরু শুরুতে তাঁদের মাইক বাজত, দুয়েকজন ছোট বা মাঝারি নেতা এসে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। যাতায়াতের পথে রোজ দেখা হত। ওরা বসে আছেন, কখনও সময় কাটাতে তাস খেলছেন। ক্রমে সেই মঞ্চে বাতি দেবার লোক কমতে থাকে। ত্রিপল আর খুঁটিগুলোও কেউ কখন যেন খুলে নিয়ে গেছে, জানাও গেল না। আর সেই চাকরি হারানো মানুষগুলো কি করল? তাদের অন্নের কি ব্যবস্থা হল, তা কেউ জানল না। এখন আর সেই ক্লান্ত স্বপ্নহীন মুখগুলো মনেও পড়েনা। এক সময়ের সেই ত্রাস জাগানো কারখানাটিও হাড় পাঁজর বার করে জরাজীর্ণ অবস্থায়, এখন নেহাত ইতিহাস পাহারা দিচ্ছে। সেই গন্ধের স্মৃতি নিয়ে আর বসে নেই কেউ।

হাল আমলে, বিস্কুটের কারখানা থেকে নানা রকম সুখাদ্যের গন্ধ ভেসে আসে। পাশ দিয়ে যাবার সময় প্রত্যেকেই টের পায়। নতুন যারা এ পথে যায়, একটু অবাক হয়ে তাকায়। সেই গন্ধে কোথাও নিরন্ন মানুষের কথা লেখা থেকে যায়। গন্ধের পরিমাপে কারো গা গুলোয়, কেউবা আনন্দ পায়, কারো মন খারাপ হয়ে যায়। সময় এসে মানুষের হাত ধরে, কিছুটা পথ নিয়ে যায়। তারপর আবার অন্যকারো দিন শুরু হয়।

মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০১৬

রূপকথার পোষাক বদল

পাড়ায় আজকাল অনেকেই শপিং মলে যায় বাজার করতে। এলাকার বাজার তো আছেই, তবে মলের বাজারে মুদিখানার অনেক কিছু এক ছাদের তলায় পাওয়া যায়, যা পাড়ার দোকানে হয়তো দেখাই যায় না। যেমন নুডলের বিরাট প্যাক বা কর্নফ্লেক্সের এক বিশেষ মিশ্রন কিম্বা হিং-এর একটি পছন্দের ব্রান্ড। এমন কত কি! গোবির মলে আসতে খারাপ লাগে না। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। চারিদিকে সুবেশ মানুষজন। যদিও পাড়ার দোকান বাজারে বেশি স্বচ্ছন্দ। এখানে, বাজারের মত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনা। তাও মাঝে মাঝে পাড়ার দাদা বৌদি বা মাসিমাদের ফরমাইসি কেনাকাটা করতে মলে চলে আসে। শপিংমলে দোকানদার বা সহ-ক্রেতাদের চালচলন আলাদা। এর মধ্যে একজন পাহারাদার কে দেখে গোবির মনে হল, কোথায় যেন দেখেছে। সবাই এক পোষাক পরে ঘুরে বেরায়, তাই আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন। তবু খানিক চেনা লাগার ছুতোয় কাছাকাছি আসে। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, “দাদা কি এখানকার?” মাথা থেকে টুপি খুলতেই লোকটির স্বরূপ বেরিয়ে পরে। এ বাবা! এ তো লোনামাটির লোক, তপন। গোবি একে ঢের চেনে, “আরে তুমি এখানে?” তপন বিড়ি খাওয়া কালো দাঁতগুলো বের করে হাসে। “এই এখন এখানে ডিউটি। তা তোমার বাড়ি এদিকে নাকি?” ব্যাস গোবি কে আর পায় কে? দোকান বাজারে একটা নিজস্ব লোক না থাকলে কি সুখ হয়? পাখনা নদীর ধার দিয়ে টানা ক্ষেত রয়েছে। সেই ক্ষেতের আল ধরে আর কিছুটা উত্তরে গেলে তপনদের বাড়ি। সেখানে তপনের বৌ, ছেলে, বুড়ো মা থাকে। গোবির মনে অনেক প্রশ্ন,

- তা তুমি এখানে রোজ আসো?
- এখন এখানে ডিউটি দিচ্ছে, আবার যখন বদলে দেবে চলে যাব। আমাদের এজেন্সির সাথে কন্টাক্ট।
- কতক্ষণ থাকতে হয়?
- তা বারো ঘন্টা তো হয়ই। নাইটও থাকে।
- ও বাবা তাহলে তো কষ্ট আছে। রাত জেগে থাকতে হয়?
- এখানে ঘুমোন যায় না। ছবি উঠে যায়। তখন কৈফেয়ত দিতে হয়। এই যে তোমার সাথে গল্প করছি তারও ছবি উঠছে।
- এ বাবা,মাটি করেছে। আমার জন্যে তুমি বকা খাবে নাকি?
- হওয়া উচিত নয়। তবে কাজ করি আমরা, আর ভুল ধরার অন্য লোক। তাই কি থেকে কিসের ভুল, সে তারাই বলতে পারে।
- তবে আমি যাই। পরে কথা হবে।
- বেশ যাও। আবার এসো।

তপনকে গোবি প্রথম আবিস্কার করেছিল মটরশুঁটির ক্ষেতে। মাথায় তালপাতার টোকা, খেটো করে লুঙ্গি পড়া, গায়ে একটা পুরাণ রঙচটা ফুলহাতা সোয়েটার। খুরপি হাতে একমনে জমি নিড়িয়ে যাচ্ছিল। আর খোলা গলায় গান গাইছিল। ওই দিকচক্রবাল পর্যন্ত ক্ষেত আর ক্ষেত। নানান রঙের সবুজে হলুদে মিশে আছে। দূরে দূরে আরও কেউ কেউ নিজের নিজের জমিতে কাজ করছে। দুয়েকটা দোয়েল ফিঙে উড়ে উড়ে ফড়িং ধরে খাচ্ছিল। আবার ছোট ছোট ঝোপের ভেতর কয়েকটা টুনটুনিতে নেচে বেড়াচ্ছে। সেই নির্লিপ্ত প্রশান্তির মাঝখানে তপনের গান কেমন মন কেমন করে দিচ্ছিল। “লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার...” এক আকাশ শূণ্যতায় ইতস্ততঃ পাখিদের ডাক আর “...কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যের মাঝার...”। গোবি তখন লোনামাটির পথে পাখনার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখন জমিতে এসে পড়েছে। অবাক হয়ে শুনছিল গান। আলের ওপর বসে পড়ে। গান শেষ হয়, তপন আবার অন্য গানে যায়। যতক্ষণ ক্ষেতে রইল, প্রায় ততক্ষণই গান ঘিরে রইল। তপনকেই জিজ্ঞেস করে “তুমি গান শিখেছো কোথায়?” তপন হাসে, মাথা নাড়ায় “এই গান কে শেখায়? ওই আকাশের উপরে যে আছে, সে”। গোবি কতক বোঝে কতক বোঝেনা। এ তো শহুরে গানের ক্লাস না, যে সপ্তায় একদিন মাস্টামশাই বা দিদিমনি আসবেন। আর গান নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেনা।

- এগুলো কি ফসল?
তপন হাসে, “আসো, খেয়ে দেখ”। এই বলে নিচু হয়ে কিছু শুঁটি ছিড়ে দেয়। গোবি তো অবাক! এইগুলো বাজারের তরকারিওয়ালার ঝুড়িতে দেখেছে। এমন আলাদা করে ক্ষেতে, এই প্রথম। যাকে যেখানে দেখে অভ্যস্থ, সেখানে না পেলে কেমন মন গুলিয়ে যায়। সেই থেকে তপনের সাথে গোবির সঙ্গত। এই শপিংমলের ঝাঁ চকচকে আবহাওয়াতে সেই মাথায় টোকা পড়া চাষীটিকে কোথায় পাবে? আর গান? কাজ করতে করতে যে সুরে ভরিয়ে রাখত, সেই বা কোথায় গেল। তাই চলে যাবার আগে, তপনের কাছে আবার যায়, জিজ্ঞেস করে,

- তুমি এখানে কি করে গান গাও?

তপন চোখ দিয়ে হাসে। বোধহয় কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ওদিকে চ্যানেল মিউজিক বেজে চলেছে। সেখানে মুম্বাই কাঁপানো সুরের দাপট। গান পুরো বোঝা না গেলেও দ্রিম দ্রিম তালের শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে। তপন চট করে টুপিটা পড়ে নেয়। চোখের নিমেষে সেই তালপাতার টোকা মাথার অবয়ব হারিয়ে যায়। এই ইউনিফর্ম পড়া মানুষটি অন্য আর পাঁচটা পাহারাদারের মতোই। এক নির্দিষ্ট গেটে নির্দিষ্ট সময় ধরে ডিউটি। সেখানে খোলা মাঠের সুরের দুলুনি, যেন কোন তেপান্তরের ওপাশ থেকে ভেসে আসে। সেখানে স্বপ্নগাছ আছে আর তাকে ঘিরে রঙিন পালকদের ওড়াউড়ি। রূপকথারা ঘর বাঁধে ঝোপেঝাড়ের আবডালে।

সোমবার, ২৩ মে, ২০১৬

পথকথা-৬ (লোনামাটি)

ট্রেনে চেপে বেশ গুছিয়ে বসে গোবিন্দ। অনেক পথ যেতে হবে। এই ট্রেনটা মাঝারি পাল্লার। শহর পেরিয়ে প্রায় প্রতিটি স্টেশনেই থামে। গড়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের মতোই। উপরে বাঙ্ক। সেখানেও মালপত্রের সাথে বহু মানুষ নিজেদের যত্ন করে গুঁজে নিয়েছে। শুধু শহরের মধ্যেকার স্টেশনগুলোতে থামে না। তাই যাত্রীরা মূলতঃ গ্রামীন মানুষ। তাদের বেশভুষা আচারন সবই স্বতন্ত্র এবং আন্তরিক। চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে কথা বলে, যেন কতদিনের পরিচিত। আজ বোধহয় ট্রেনটি একটু লেট চলছে। এইসব মানুষরা নিত্য এই গাড়িতেই যাতায়াত করেন। গাড়ির গতিবেগ দেখে বলে দিতে পারেন ড্রাইভারে বয়স বা অভিজ্ঞতার পরিমাপ। কিম্বা আজ ড্রাইভার সাহেবের তাড়া আছে কিনা। গোবিন্দ কোন আপিস করতে যাচ্ছেনা, তাই ট্রেনের দেরী হলেও কিছু যায় আসে না।

জানালার বাইরে চোখ চালিয়ে নিশ্চিন্তে থাকে। বাইরেটা যে এত মনোরম লাগে! কেমন মায়াবী সবুজে মোড়া। ছোট ছোট জনপদগুলো দ্রুত পার হয়ে যায়। দেখলেই কেন যেন মনে হয়, দু দিন এখানে থেকে গেলে হয়। তবে ট্রেনের ভিতরটিও অতীব রঙীন। একের পর এক নানান ফেরিওয়ালার মিছিল। পুরো পথটাকে কেমন ঘটমান করে রাখে। একজন গজাওয়ালা এলেন। এসেই বলেন, “আজ আপনাদের ধরতেই দেব না। কারণ ধরলেই ছ্যাঁকা লাগবে, এ এমন টাটকা। সদ্য কড়াই থেকে নামিয়ে আনা”। তার বাচন ভঙ্গী আর বলার ভাষাতে যাত্রীরা আমোদ পায়, বিক্রিও হয়। এক প্রৌঢ় হাত পাতে একটা নমুনা সংগ্রহের জন্য। বোঝা যায়, গজাওয়ালা খুব খুশি হয়নি। অনেক ফেরিওয়ালা নিজে থেকেই নমুনা বিতরণ করে। তারা আবার অপমানিত হয়, যদি কেউ নমুনা নিতে অস্বীকার করেন। গজাওয়ালা তেমন নয়। সে নেমে গেলে পরে, আরেক সহযাত্রী একটি গল্প বলতে শুরু করে। যেন গোবিন্দকেই শোনাচ্ছেন।

দুই বন্ধু ছিল। তাদের একজন পাশ-টাশ দিয়ে একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলে। অন্য বন্ধুটি স্টেশনে একটি পানের দোকান দেয়। ছোট গুমটি আর কি! চাকুরে বন্ধু প্রতিদিন সকালে ট্রেন ধরতে স্টেশনে আসে, পানওয়ালা বন্ধুর সাথে একটু খোশগল্প করে, তারপর ট্রেন এলে চলে যায়। প্রতিদিনের আড্ডার মাঝে, সে একটি এলাচ চেয়ে নিয়ে খায়। এমন করে অনেকদিন যায়। সকালে আসে, গল্প করে, এলাচ মুখে নেয়, ট্রেন ধরে, চলে যায়। প্রায় বছর পাঁচেক পর কোন এক ঘটনা নিয়ে দুজনের মনোমালিণ্য ঘটে। তখন পানওয়ালা বন্ধুটি অন্যজনের কাছে কিছু টাকা ফেরত চায়। চাকুরে বন্ধুটি তো অবাক। সে চাকরি করে বলে প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে। পানওয়ালা বন্ধুটির চেয়ে, তার আয় যায় বেশি। তারপরও পানওয়ালা উত্তমর্ণ্য, ভাবতেই পারে না। পানওয়ালা বন্ধু তখন হিসেবের খাতা নিয়ে বসে, গত পাঁচ বছরে চাকুরে বন্ধুটি প্রায় ১৩২৮টি এলাচ নিয়ে খেয়েছে। সব মিলিয়ে এলাচের গড়দাম অনুসারে ৫৩৭টাকা মতো পাওনা।

গল্পের শেষে সহযাত্রীটি সেই গজা-র নমুনা প্রার্থী প্রৌঢ়র দিকে ফিরে বলেন, “চেয়ে খাবেন না। কারণ যে দিচ্ছে, সে খুব যে খুশি মনে দিচ্ছে, তা নয়”। গোবিন্দর বেশ লাগে, কেমন সুন্দর ভাবে ভদ্রলোককে শিক্ষা দিলেন। এরমধ্যে আরো অনেক ফেরিওয়ালা ওঠেন, একজন বৃদ্ধদের আবার করে কবাডি খেলার ওষুধ বিক্রি করছেন। কত রকম চোরাগোপ্তা কথা, ঠাঁই পেতে হলে নিয়মিত রেলযাত্রা করতে হবে।  একজন তার পসরা বিক্রি করতে গিয়ে বলে ফেলেন, “আজ টাকাপয়সা কম থাকলে নেবেন না। কোন অসুবিধা নেই। পরে সময়মতো নিলেই হবে”। সম্ভবতঃ বদহজমের ওষুধ। এইসব ফেরিওয়ালারাও প্রতিনিয়তঃ তাদের মতো করে সৃষ্টিসুখে আছেন। নিতান্ত পেটের তাগিদ বলেই উপাচারের বাহুল্য নেই, উপস্থাপনা দৃঢ় এবং সরাসরি।

অবশেষে গন্তব্য, লোনামাটি পৌঁছায় গোবিন্দ। শহর ছাড়িয়ে তিন ঘন্টার দূরত্বে যে এমন জায়গা আছে, না এলে বোঝাই যায়না। একটা মোবাইলেও সিগনাল নেই। কি যে ভালো। একরত্তি নদীটা বয়ে চলে, কেউ এল, দু দন্ড পাশে বসল ওর বুঝি গায়েই লাগে না। বিকেলের আলো নৌকাকে টেনে নিয়ে যায়, অস্তমিত সূর্যের দিকে। বড় বড় উলুর ঝোপে হাঁসগুলো কি যেন খোঁজে আবার ছুটে এসে জলে ডুব দেয়। গোবিন্দ কাউকে না জানিয়ে মাঝে মাঝে এখানে চলে আসে। প্রথম প্রথম নতুন মানুষ দেখে, গ্রামের লোক জিজ্ঞেস করত, “কোন বাড়ি এসেছেন? কতদিন থাকবেন? কোথা থেকে আসছেন? কেন আসছেন? কি করেন?” ইত্যাদি নানা কথা। তা তো ঠিক। কে কোথা দিয়ে চলে আসে, কত রকম ফন্দি ফিকির নিয়ে। গোবিন্দ তেমন বলার মতো কিছু করেও না, যে গুছিয়ে বলবে। যদিও খুব ব্যস্ত থাকে, তবু কাউকে কি বলা যায়, যে সে বাজার করতে, ইলেক্ট্রিক বিল জমা দিতে বা ফেলে আসা জিনিস পৌঁছানোর কাজ করে। শহরে যেমন মানুষ আলগা আলগা, পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকছে, কে আসছে জানা থাকে না। গ্রামে ঠিক তেমনটা নয়। কার বাড়িতে কে এল, অন্যরাও খবর রাখে। শুরুতে গোবিন্দ এক খুড়তোতো দাদার পিসতুতো কাকা মাস্টারবাবুর নাম করে চলে এসেছিল। ওই ওদের পাড়াতে কোন এক সময় ভদ্রলোক নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিলেন। তা ভুল করে সেই কাকার মেয়ে বাথরুমে কানের দুল ফেলে চলে আসে। পরে যখন খোঁজ মিলল, কে পৌঁছে দেবে? ব্যাস পাড়ায় এক অধটা কাঠ বেকার থাকার এই সুবিধে। সেই সুযোগে গোবিন্দও এই জায়গার খোঁজ পেয়ে গেল। এখন অবশ্য শুধু মাস্টারবাবুর কথা বলতে হয়না, এই গ্রামের সে অনেককেই চেনে।

এখানে আসতে ট্রেনে চাপতে হয়। তারপর বেশ কিছু বড় বড় জংশনে গাড়ি পাল্টে পাল্টে লোনামাটি স্টেশনে নামতে হয়। এই স্টেশনে এখনও প্ল্যাটফর্ম হয়নি। সিঁড়িওয়ালা ট্রেনই থামে। আজকাল অন্য গাড়িও থামে, তাতে ওঠা নামা বড্ড মুশ্কিল। গোবিন্দর এই স্টেশনের কাছাকাছি এলে মন ভালো হয়ে যায়। তড়াক করে লফিয়ে নামে। নিচে পাথরে খচমচ করে ওঠে। পুরো স্টেশন চত্বর কৃষ্ণচূড়ায় ঢাকা। এখন যদিও জৈষ্ঠ্য শুরু হয়ে গেছে, গাছেদের ফুলের বিরাম নেই। লাল ফুলের ফরাস পাতা যেন। ভজন পাল পিছন থেকে বলে, “ভাইপো, আমরা হাত একটু ধর। নিজে তো হুড়ুম দিয়ে নামলে, আমাদের বুড়ো হাড়। পারি নাকি?” ভজন পালের সাথে ট্রেনেই আলাপ রুমাল ফিরি করে। সকালের ট্রেনে শহরে গিয়ে এই বেলার গাড়িতে ফেরে। দিনের এক দুটো ট্রেনই আছে এই স্টেশনে দাঁড়ায়। মাস্টারবাবু কে কাকা বলাতে, গ্রামের মোটামুটি সব মাঝবয়সীদের কাছে গোবিন্দ গণ-ভাইপো হয়ে গেছে। লোনামাটি স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে একটা ছোট জঙ্গল পেরোতে হয়। আগে এই জঙ্গল ছিল ডাকাতদের আস্তানা। এখন অবশ্য ডাকাতরা গোয়ালা হয়ে গেছে। তারা মোষ পোষে। সাইকেলের দুপাশে দুধের ক্যান ঝুলিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে। জঙ্গলের মাঝে সেই ডাকাতে গোয়ালাদের ছোট বসত। সেইখানে পথে ওপর সার দিয়ে বড় বড় মোষরা বসে জাবর কাটে। তা ডিঙিয়ে আসে ছোট্ট নদী, নাম তার পাখনা। পাখনা পেরোতে নৌকা নেয় একটাকা। তারপর আসবে মাস্টারবাবুর গ্রাম। জঙ্গল লাগোয়া বলে পাখিদের ডাকে চতুর্দিক মেতে থাকে। যতবার গোবিন্দ আসে ওরা যেন ঠিক চিনে ফেলে। তাই তো এত ডাকাডাকি করে। কিন্তু গোবিন্দর আর পাখিদের চেনা হয়ে উঠল না। প্রতিবার এখান থেকে ফিরে ভাবে লাইব্রেরিতে খোঁজ নেবে পাখি নিয়ে কোন বই আছে কিনা। কিন্তু সে আর হয় না। অবশ্য না জানার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। সব কিছু তো চিনে ফেলতে নেই।

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

রাস্তার দিক

রাস্তা যখন সোজা পড়ে থাকে, সামনে থেকে কালো গভীর পথ। এলোমেলো বৃষ্টি এসে সেই কালিমা আরও গাঢ় করে দেয়। আতান্তরে পড়ে খোলা মন। সেখানে বাতাস ঘুলঘুলির ঘুর পথে নিয়ে আসে চড়াইয়ের ঠোঁটে করে খড়কুটোর সন্দেশ। একটা খবরেই মনের আঙিনায় আলপনা দেয়, সে খবর খুব বিরাট কিছু, যে তা নয়। গোবিন্দ এই সব দেখে আর ভাবে, ঠাঁই পায় না। বাজারে দেখা হয় মান্তু দার সাথে। ভদ্রলোক এই কাছাকাছি কোথাও থাকেন, বাজারে সহ-ক্রেতা হিসেবেই তাকে দেখেছে, অন্য কোথাও যে মান্তুদার অস্তিত্ব আছে মনেও হয় না। যেন মান্তু মানেই একটা পুরানো লুঙ্গি, হয়তো লাল ছিল কোনকালে, এখন রঙচটে একটা অন্যরকম কিছু হয়েছে। স্বভাবে একটু সখী ভাব। গলায় গান ও খিস্তি। সব দোকানদারের সাথে তার ঠাট্টার সম্পর্ক। কখনও মাত্রাতিরিক্ত কটু কথায় তিক্ততার সৃষ্টি হয়। গান শুনে মন ভরে। বিরক্ত দোকানদার কুকুরের ডাক ডাকে। মান্তুদা গায়ে মাখেনা অনায়াসে রাগী প্রতিপক্ষকে আলিঙ্গন করে।

আজ মান্তুদা খুব খুশি। তাদের বাড়ির কাজের মাসির মেয়ে সরকার থেকে থেকে সাইকেল পেয়েছে। সেই আনন্দে মিষ্টি কিনছে আর গান গাইছে। লোকে আড়াল নয়, সামনেই বলে, পাগল। মান্তুদা বাছা বাছা খিস্তি উচ্চারণ করে সেই পাগল উপাধি ফিরিয়ে দেয় বক্তার ঊর্দ্ধতন চোদ্দ পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে। সরকার বাইরে থেকে ব্যবসা আনলো কি আনলো না, তাতে মান্তুদা বা তার বাড়ির কাজের মাসির কিছু এসে যায় না। তবে এই সাইকেলটি হওয়াতে মেয়েটি প্রায় দুকিলোমিটার দূরের স্কুলে যেতে পারছে। এটা ওই পরিবারটি এবং ব্যাচেলার মান্তুদার বড় আনন্দের কথা। একই সাথে কন্যাশ্রীর টাকা পেয়েছে, পাচ্ছে দুটাকা কেজি চাল। এই জনমোহিনী কাজের গুঁতোয় হয়তো কোষাগার ফাঁকা হয়ে গেল। কাগজ পড়া মিষ্টির দোকানদার তিলক একবার বলার চেষ্টা করে। মান্তুদাকে সে কথা বলে, খাল কেটে কুমির আনা। খিস্তির এমন সম্ভার খুব কম মানুষের কাছে আছে। থাকলেও অনেকের তা প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকে না। মান্তুদা অমায়িক অর্থাৎ বিনা মাইকে সারা বাজারের সকলকে শুনিয়ে তিলকের ভুত ভাগায়। শেষে অন্যরা মিলে তিলককেই থামায়, যাতে মান্তুদাকে আর উত্যক্ত না করে।

গোবিন্দ লক্ষ্য রাখে সব। বাজার ছাড়া আরেক জায়গায় মান্তুদাকে দেখে সেদিন চিনতে পারেনি। আসলে যে মানুষটাকে যেখানে দেখে অভ্যস্থ, তার বাইরে তার যে কোন পরিচয়, থাকতে পারে সেটাই আমাদের অজানা। লাল শালুর পতাকা কাঁধে মিছিলে চলা মানুষটাকে প্রথমে চেনা চেনা লাগলেও বুঝতে পারেনি কে? সেই লুঙ্গি নেই, হাতে বাজারের থলেও নেই। মান্তুদা ঠিক নজর করে গোবিন্দকে। দুরন্তবেগে গালি সহকারে জিজ্ঞেস করেন, “...মরণ, অমন হাঁ করে দেখছিস কি? আমায় তোর পছন্দ হল না কি?” গালি শব্দটি কানে যেতেই টনক ঠং করে বেজে, নড়ে ওঠে। তখন চিনতে আর ভুল হয়না, ইনি কিনি? লম্বা একটা মিছিল। সামনে হুডখোলা গাড়িতে, নেতা। পিছনে সার সার পদাতিক বাহিনীর একজন হয়ে মান্তুদা চলেছে। পরে এক অন্য সময়, দোকানদার তিলক জিজ্ঞেস করে, “কি গো দল বদল করে ফেললে?” গালি শব্দের স্রোত বাঁচিয়ে গোবিন্দ কান পাতে মান্তুদা কি বলে, শোনার জন্য। “...রাস্তা কি পাল্টায়? একসাথে চলার লোক হয়তো পাল্টে যায়”। শুনে তিলক বলে, “বাঃ সুযোগ বুঝে পাল্টি মারলে। এতদিন লাল শালু বয়ে বেড়ালে, আজ হঠাৎ জামা পাল্টে অন্যদলে!”

-“ ... তোরা বুঝিস না। আমাদের মতো মানুষের এক্তিয়ার কতটুকু? খাওয়ার জোগাড় করা, আর সেটুকু খেয়ে দিনটা পার করা। সেটা করতেই সময় চলে যায়। ভাবনা করার মত সময় বা ক্ষমতা কোনোটাই নেই। এতদিন যে দাদা এসে রুটি আলুরদম খাওয়াতে নিয়ে যেত, সেই আসছে ওই একই রকম বা তার চেয়ে ভালো টিফিনের ব্যবস্থা করতে। আমি কি তোদের মতো পাগল, যে যাবো না?” মান্তুদাকেই সবাই পাগল বলে, সে তিলককে পাগল বলায় আসেপাশে সবাই হেসে ফেলে।

মানুষ চলতে চায়, যেকোন ভাবে হোক। খুব বেশি ভাবতে হবে না কোথায় যাচ্ছি। তাদের চলার একমাত্র শর্ত দলবদ্ধ যাত্রা। গন্তব্য ঠিক করার দায়িত্ব তাদের নয়। একমনে হঁটে যাওয়া একমাত্র কাজ। অন্য কেউ হাল ধরে থাকবে। আমি ভার সঁপে দিয়ে হাল্কা হয়ে থাকব পালকের মতো। হাওয়া বয়ে নিয়ে যাবে, হাওয়ার মতো। সে যদি ঝড়ের হাওয়া হয়, তাই সই। ঘরের ঘুলঘুলিতে এক অধটা চড়াই এল বাইরের খবর নিয়ে। তাদের ঠোঁটে ধরা খড়কুটো। সেখানেই লেগে আছে অন্য খবর। রাস্তার খবর। সে রাস্তা বৃষ্টিজলে ভিজে আরো কালো হয়ে ওঠে। সেখানে মান্তুদার মতো অনেকেই। কাজের মাসির মেয়ে সাইকেল চালায়। রাস্তা থাকে রাস্তার মতোই, শুধু চলার সাথী বদল হয়। মান্তুদাদের কথা কোন স্বতন্ত্র কথা নয়। গোবিন্দ রাস্তার পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করে, যাতে দেখা যায় কে কোনদিকে যাচ্ছে। তবে রাস্তার পাশও একটা দিক। এই দিক না অন্যদিক?

সোমবার, ১৬ মে, ২০১৬

বসত

বিকেলের মোড়কে জলঙ্গীর জলে পাখিদের ডাক মেশে। পানকৌরিরা আজকের মতো ডানা শুকিয়ে নিচ্ছে, পাড় থেকে হেলে পরা বাবলাগাছের একটা ডালে। তিরের ফলার আকারে বকেদের সারি ঘরপানে চলল। চন্দ্রমাধব দাস তাঁর একতারা গুছোয় উঠবে বলে। গোবিন্দর সাথে তাঁর আজকেই আলাপ। নদীর পাড়ে বসে গল্প হচ্ছিল। খুব অমায়িক গলায় বলে, “আগামী মঙ্গলবার পূর্ণিমা, নতুন ঘর বেঁধেছি। ওইদিন একটু নামগান হবে। সেবা হবে। এসো কিন্তু”। সেই মঙ্গলবার পর্যন্ত থাকা সম্ভব নয়, তাই আগেই গেছে দেখা করতে। ছোট্ট বাড়ি। সুন্দর করে নিকোনো উঠোন। দরমার বেড়া আর করোগোটেড টিন দিয়ে ছাউনি। মাটির উনোন, দুয়েকটা হাঁড়ি কড়াই। ঘরে রাধামাধব। “এর চেয়ে আর বেশি কি লাগে?” বলতে গিয়ে চন্দ্রমাধবের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে এক মুঠো মুড়ি বাতাসা আর জল। “আমাদের সঞ্চয় করতে নেই। যা জুটেছে তাই দিলাম”।  এইসব দিন বা মানুষ খুব দূরবর্তী নন। তবে ক্রমশঃ অপসৃয়মান। একান্ত নিজস্ব দেশজ সম্পদকে ঠেলে দিচ্ছে আরও দূরে।

গোবিন্দর এমনই এলোমেলো ভ্রমন। যেখানে যত বেগার, সেখানে তার ডাক পরে। কোন ছেলেবেলায় অমৃতাদিকে ভালো লাগত। পাড়ায় ডাকসাইটে সুন্দরী থকলে যা হয়, সাইকেল যুবকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। অমৃতা গোবিন্দকে প্রশ্রয় দিত। এলেবেলে বা দুধভাত। তাই সই, গোবিন্দর তা পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। এর তার চিঠি এনে দিত। কখন কখন অমৃতাদিও তাকে দিয়ে কিছুমিছু পাঠাত। তারপর অনেকদিন কেটে গেল। ছেলেবেলার রূপোলি ঝালর কেটে এখন অমৃতাদি শহরে থাকে। স্বামী পুত্র কন্যা নিয়ে ভরপুর সংসার। সেদিন হঠাৎ ডাক আসে। অমৃতাদির বাবার সাথে বাজারে দেখা, “তোকে অমৃতা যেতে বলেছে”।

ঠিকানা জুটিয়ে গোবিন্দ ঠিক হাজির। ওরেবাব্বা! বত্রিশ তলায় অমৃতা থাকে। ওদের দুহাজার স্কোয়ারফুটের ফ্ল্যাট। বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয়, ঝড় হচ্ছে এমন হাওয়া। নিচের দিকে হারিয়ে যাওয়া শহর। কত ছোট! খেলনার বাড়িঘর, গাড়ি, ঘোড়া। তাকালে পা শিরশির করে। কি জানি যদি উড়ে যায়। মেঘগুলো কি জানালার কাছে চলে এল? অমৃতার নতুন বাড়ির সবকিছুই নতুন। আসবাবপত্র, আধুনিক ঝাড়লন্ঠন, নিচে দামি কার্পেট। শোকেসে সাজানো সারি সারি কাচের গ্লাস আর রকমারি পানীয়র বোতল। “তোমার তো মেঘের দেশে বাড়ি গো। খুব স্বপ্ন দেখ নিশ্চই”। কিন্তু অমৃতাকে দেখে আগের মতো লাগল না, কেমন চোখের তলায় কালি পড়েছে। চেহারার জৌলুশও যেন কম। অমৃতা দামি কাচের বাসনে খেতে দেয়, থালায় ভরা কত কি? গোবিন্দও না না করেও, করে না। পরিপাটি খেয়ে নেয়। শেষে একটা বড় প্যাকেট নিয়ে আসে। সেখানে সাজানো অনেক ফল মিষ্টি। “এগুলো কি হবে?” অমৃতাদি বলে, “বাবাকে দিবি। ওঁরা কেউ তো এ বাড়িতে আসেনা। আমারও আর যাওয়া হয়না”। গোবিন্দ কিছু জিগেস করেনা। না বলতেও অনেক কথা বুঝে যায়। সেই ছোটবেলার মতই। যখন চিরকুটগুলো বয়ে এনে দিত। কোনদিন খুলে দেখেনি। কিন্তু বুঝে যেত ভিতরে কি আছে। মানুষের মন খুলে দেখার দরকার হয়না। গোবিন্দ বুঝে যায়। হাসি মুখে বিদায় নেয়। “আবার আসবি কিন্তু। এবার একটা মোবাইল ফোন সাথে রাখবি। দরকারে ডাকা যায়”। গোবিন্দ নেমে আসে, বত্রিশতলা থেকে জমিতে। গোবিন্দ এখন জানে দরকারেই তার ডাক পরে, সেই ছেলেবেলার মত, এখনও এলেবেলে। ঘাড় উঁচু করে দেখার চেষ্টা করে। ব্যালকনিতে অমৃতা দাঁড়িয়ে যতক্ষণ চোখের আড়ালে না চলে যায়। 

আসার পথে একটা বস্তি চোখে পড়ে, খালের ওপর দিয়ে একটা ব্রিজ রয়েছে। তার নিচে প্লাস্টিকের আড়াল দিয়ে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ ঘর থাকে। খাল দিয়ে বয়ে চলেছে শহরের ক্লেদ আবর্জনা। তার ঢালু জমিতে কালো নোংরা জলের খুব কাছাকাছি উদোম বাচ্চারা খেলছে। আর রাস্তার ধারে বেশকিছু ভ্যান, রিক্সা সার দিয়ে সাজানো। এইখানকার পুরুষদের জীবিকা, মেয়েরা হয়তো অমৃতাদিদের ফ্ল্যাটগুলোতে যায়।

এর বেশকিছুদিন পর আবার এক মেলাতে দেখা হয় চন্দ্রমাধবের সাথে। ইদানিং নাকি এখানেই তাঁর ডেরা। “জলঙ্গীর পাড়ে যাওনা?” উত্তরে হাসিতে ভরিয়ে দেয় চন্দ্রমাধব, “তা রাধামাধব নিয়ে গেলেই যাব। সারা দুনিয়াটাই তো ওনার। যখন যখানে বসি, সেখানেই বসত তৈরি হয়”। গোবিন্দ সবটা বোঝেনা। তবে ভালো লাগে। এই ডেরাটা আগেরটার চেয়েও ছোট। তবে ভিতরে রাধামাধব আর নিরাভরন তৈজস। এই মেলাতে শুধু হাঁড়িকুরি আর চন্দ্রদের গান হচ্ছে না। অনেক আধুনিক জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছে দামি দোকান। সেখানে বড় বড় যন্ত্রে বাজছে একালের গান।

অমৃতাদির বাক্সটা ওর বাবাকে দিয়ে, গোবিন্দ খানিক বোকার মতোই জিজ্ঞেস করে, “তুমি ওর ওখানে গেলেই তো পারো। দুঃখ করছিল”। বৃদ্ধ চোখ দিয়ে হেসে বলে, “নিজের মাটি ছুঁয়ে না থাকলে কেমন অপমান লাগে, ও তুই বুঝবি না”। গোবিন্দ বোঝেনা। সত্যিই বোঝেনা। মানুষের তল কোথায়, তালুকইবা কোথায়, কে বলতে পারে?

বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

বিকিকিনির সম্পর্ক

বিপণনের দুনিয়া আমাদের জীবনে নতুন মাত্রা আনে। নতুন ফ্যাশন নতুন বাহার নতুন শব্দ। আমদানীকৃত অলঙ্কার আসে সাগর পাড়ের লোনা হাওয়ার সাথে। বনিকের মানদন্ডে যুক্ত রাজদন্ড এখনও পা ফেলে, তবে খুব চুপিসারে আসে। এ রাজত্ব ফেলে আসা সময়ের মতো উচ্চকিত নয়। রাজত্ব বিস্তৃত হয় সমাজের অভ্যন্তরে মননে মেধায় জীবনে। অনায়াসে পরাধীন হয়ে পড়ি, নিজের অজান্তে।

ইংরাজির ‘শপ’ শব্দের অর্থ দোকান। এ শব্দের সাথে মুখ্য যোগ দোকানদারের, তারপর ক্রেতা। বিপণন বিজ্ঞান সংজ্ঞা পাল্টে দিচ্ছে। দৃষ্টিকোণ অনুসারিত হচ্ছে বিক্রেতা থেকে ক্রতার দিকে। ‘শপ’-এর ক্রিয়াকরনে ‘শপিং’, বিক্রি না বুঝিয়ে ক্রয়কে বোঝানো হল। আর ‘শপার’ বিক্রেতা না হয়ে হলেন ক্রেতা। কারন পরিবর্তিত পরিবেশে ক্রেতা ভগবান। তার ভজনা করাই তাবড় বিশ্ব বিপণন দুনিয়ার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও মোক্ষ। আর এই শপিংএর পীঠস্থান হল ‘শপিংমল’। দরজা খুলে ঢুকতে না ঢুকতে গলে গলে পড়ে সুখ। রিনরিনে কোলাহল আর রঙিন আবহাওয়া মুহুর্তে ভুলিয়ে দেবে সমস্ত দুঃখ কষ্ট। পরিসংখ্যান বলে ২০১৩ পর্যন্ত ৫৭০টি এমন শপিংমল আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে এবং বলাই বাহুল্য আরও হচ্ছে। আজকের প্রজন্মের কাছে এই দোকানপুজ্ঞগুলো শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, বেড়ানোর, প্রেম করার, সময় কাটানোর জায়গা। অন্যান্য দোকান বাজার ছাড়া সিনেমা, রেস্তোঁরা, হেল্থ ক্লাব, বাচ্চাদের কিডস জোন কি নেই। এক্কেবারে যাদুতে মোড়া সব পেয়েছির আসর বলতে যা বোঝায়, এ যেন তাই।

ইংরাজিতে আরেকটি শব্দবন্ধ আছে ‘মম এন্ড পপ শপ’। অর্থাৎ কিনা মা বাবার দোকান বা পরিবার পরিচালিত ছোট দোকান। ডিমপুকুরে গোবিন্দর বাড়ির পাশের দোকান। যাদের বিশ্বজোড়া শৃঙ্খলবদ্ধ দোকানমালা নেই। একটি ছোট দোকান ঘিরে তাদের বেঁচে থাকা। যে দোকানদার কে গোবিন্দরা সবাই চেনে দামোদর, সুভাষ, অনুপ, আশিস এবং তার বৃদ্ধা মা, শঙ্কর, মিলন, তুলসী, যোগেশ এমন সব কত নাম। অমল কাকুর মনিহারি দোকান তাকে বিজয়ায় প্রণাম করে। বাড়িতে গোবিন্দর বাবা অসুস্থ হলে ফলওয়ালা অনুপ তাকে দেখতে আসে। তিনদিন পরে বাজারে গেলে অনায়াসে ফেরত পায় আগের দিনে ভুল করে ফেলে আসা বিস্কুটের প্যাকেট। কখনো সাইকেল করে শঙ্কর বাড়ি বয়ে দিয়ে আসে ফেলে আসা মাছের থলি, কিম্বা ফেরত দেয় গত সপ্তাহে মাছের জন্য ভুল করে বেশি নিয়ে নেওয়া দুশো টাকা। গোবিন্দ বাজার করতে গেলে খোঁজ নেয়, জয়দেব দুদিন ধরে কেন আসছে না? নদীয়া জেলার সব্জী খুব সুস্বাদু। অনেক মানুষ অনেক দুর থেকে এই বাজারে সব্জি কিনতে আসেন, তার কারন জয়দেব সুদূর সমুদ্রগড় থেকে প্রতিদিন নানান পদ বয়ে নিয়ে আসে এই বাজারে। আবার নিতাইএর মতো ব্যবসায়ী আছে, যারা সুযোগ বুঝে পচা আলু দিয়ে দেয়। পড়শী দোকানদাররা আড়ালে সাবধানও করে দেয়। বাড়িতে বিয়ে বা পরবে এই অনাত্মীয় বাজারওয়ালাও নিমন্ত্রণ পায়। সব মিলিয়ে বাজার শুধু কেনাকাটার নয় একটা সম্পর্কের বুনোট।

পাশাপাশি মহার্ঘ্য শপিংমলের দোকানে যে সব বিক্রেতারা থাকেন, তাঁরা মূলত কর্মচারী। এক ইউনিফর্ম পরা প্রত্যেকে। আলাদা করে চেনার উপায় নেই। তাই বিকিকিনি বাইরে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনা। একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝাই যায় দামি বা কেতা দুরস্ত পোষাকের অন্তরালে হয়তো একটি গ্রাম্য গৃহবধূ, যার সাধ্য নেই যে সব পণ্য ব্যবহার করার, সেই সমস্ত পণ্যের গুণকীর্তন করে বিক্রির চেষ্টা করছে। এখানে বিক্রেতাটি থাকেন আড়ালে। তিনি সর্বশক্তিমানের মতো, বিশ্বজোড়া তার বিস্তার, বহুজাতিক তার মালিকানা। তার অসংখ্য চোখ কান, যা প্রতি নিয়তঃ তার বিশ্বস্ত ক্রেতা আর সম্ভাব্য ক্রেতাদের পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ, সাইনবোর্ড ইত্যাদির মাধ্যমে। তাই শপিংমলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ-বিক্রতাটি বুকে লেবেল লাগানো শুধুমাত্র সেই মহামহিমের প্রতিনিধিমাত্র। তার আলাদা পরিচিতি হতেই পারে না। ব্যক্তিগত সুখ দুঃখ অনেক অতীত স্বাক্ষর। খুব জটিল মনোবিজ্ঞান আর ব্যবহারিক তথ্য সংগ্রহ করে অনায়াসে বুঝে ফেলে, ক্রেতা কখন ঠিক কি চাইতে পারে বা কেন চাইতে পারে। তার যোগান অব্যর্থ উপায়ে ঠিক সময়ের আগেই তার চোখের সামনে সুদৃশ্য মোড়কে ঝুলিয়ে দেওয়াই এই বিপণন দুনিয়ার মূলমন্ত্র।

সময় তার নিজের নিয়মে গড়িয়ে চলে, যা আগে ঘটেনি তা যে এখন ঘটবে না, কেউ বলতে পারে না। হয়তো সময়ের নিজেরও সেটা বলার স্বাধীনতা নেই। তাই আমরা যা পাই, তাই নিয়ে হেসেখেলে দিন গলিয়ে এগিয়ে যাই। ফেলে আসা দশকের ফেরিওয়ালারা যেমন আজ আর নেই। বেলফুল, আতর, শোনপাপড়ি-সন্দেশ, কেক-লো, কুলফি বরফ এমন কত নানা প্রয়োজনীয় পসরা সাজিয়ে তারা আসতো। তারাও তো আজ বিস্মৃতির গহিনে। পাড়ার বাজারের আব্বাসের মা হরিয়ে গেলে কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হবে-কি হবে-না, কেউ জানে না। তবে ঈদের পর শাকপাতার স্বল্প সম্ভারের মধ্যে থেকে টিফিন কৌটো বার করে কে দেবে? বাড়িতে গড়া পরবের মিষ্টি। সাথে ফোকলা দাঁতে একরাশ আশীর্বাণী। মানুষে মানুষে যোগাযোগ-ই একমাত্র উপায় পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে। যদি সেই যোগাযোগ হয় কেবল মাত্র কৃত্রিম আর কোন অন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত তবে আশঙ্কা বেড়েই চলে।

ব্লগ এবং বই পাওয়ার ঠিকানাঃ https://souravstory.com

 এখন থেকে ব্লগ সহ অন্যান্য সব খবর এবং বই পাওয়ার ঠিকানাঃ https://souravstory.com