শনিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৬

অজানার আনন্দ

হিরক রাজের শিক্ষা মন্ত্রীর সেই অমোঘ বচন, "জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।" একবার এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করলে, তার সিদ্ধি রোধ করে কে?

চতুর্দিকে কুরু-পান্ডবের সাঁজোয়া গাড়ি দাঁড়িয়ে, সারি সারি। বেচারা অর্জুনের দাঁত কপাটি লেগে যাবার জোগাড়। অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়ে নন্ প্লেয়েইং ক্যাপ্টেনের শরণাপন্ন।
- স্যার, এরকম হবে তো ভাবিনি। আমি পারবো না স্যার।
সোজা কথায় হাত-পা পেটে মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়া, আর কি? কিন্তু এত কান্ড করে, যিনি একটু একটু করে যুদ্ধের গুটি পাকিয়ে এনেছেন, তার কি হবে? সভ্যতার প্রতিটি ইনিংসে অবতীর্ণ হবেন বলে যিনি কথা দিয়েছেন, অর্জুনের মতো বালখিল্যের কারণে ওয়াক ওভার দিয়ে দেবেন? এমনটা হলে টি-আর-পির দফারফা। অগত্যা শুরু হল জ্ঞান বপন আর জ্ঞান উন্মেষ। মায়ার বাঁধন কাটিয়ে, সার উপলব্ধি। তুমি কেউ নও ভাই, কেবল নিমিত্ত মাত্র। কোন ওভারে কটা নো বল, প্রথম বলে চার হবে না শূণ্য- সব আগে থেকেই নির্ধারিত। অগত্যা বেচারা জনগণ যুদ্ধে মন দেয়। পাল্টা প্রশ্ন বারন আছে।
- স্যার যদি সব আগে থেকেই সেট করা থাকে, তবে আর আমাদের টানাটানি কেন?
জানা আর অজানার এই সূক্ষ্ম সুতোর সীমানা, আবহমান কালের। জ্ঞানবৃক্ষের ফলের স্বাদ কেমন? তা জানার অত কৌতুহল না থাকলেই ল্যাঠা চুকেই যেত।

পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র অজানা। প্রশ্ন জানার পর উত্তর অজানা। সেখানে অবশ্য কিছু বিপদভঞ্জন বন্ধু উপস্থিত। জানালার পাশ অথবা শতাব্দী প্রাচীন ইউরিনালের ভিতর এত দিস্তা দিস্তা সাহায্যলিপি, সে তো সেই পরমারাধ্য "ফ্রেন্ড ইন নিড"-এর সমতুল।

এক তথাকথিত বিখ্যাত কলেজ হস্টেলের ঘরে একটি বালক অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে গাঁতিয়ে চলেছেন। কোন এক আপাত দূরুহ জ্ঞানান্বেষণে। দৃঢ়কল্প চোখে কেবল এবং কেবলমাত্র পরীক্ষারূপী পাখির চোখ। সেখানে জানার অবকাশ যত, তার বহুগুণ নম্বর পাবার অভিলাষ। অপর একটি অকালপক্ক আঁতেল বালক সহপাঠী, সেই ঘরে প্রবেশ করলে, আমাদের পড়ুয়া ছাত্রটি সামান্য বিরক্ত হয়। এই আঁতেল সম্প্রদায় যুগে যুগে অবতীর্ণ হয়। তাদের না থাকে চক্ষুলজ্জা, না থাকে পরকাল বা উত্তর-ছাত্র পর্বের ভাবনা। পরীক্ষা ও তার প্রস্তুতির পরোয়া না করে উচ্চৈঃস্বরে আবৃত্তি শুরু করে। নজরুলের 'বিদ্রোহী'। কিছু কিছু শব্দের ব্যঞ্জনায় এমন কিছু থাকে, যা অতি বড় নিরাসক্তের মন কে আকর্ষন করতে বাধ্য। শব্দব্রহ্ম বলে কথা। কাব্য নিরসনে পড়ুয়া ছাত্রটি সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকায়।

- তুই তো বেশ ভালো আবৃত্তি করিস।

আঁতেল খোকাটি নিজের আঁতেলত্ব নিয়ে অতি-অবহিত। যেকোন প্রশংসাকে কি করে কাঁধের কম্পনে গ্রহন বর্জনের মাঝামাঝি রাখতে হয়, সে জানে। কিন্তু এক অত্যাশ্চর্য বিষ্ফোরণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, যখন শোনে পড়ুয়া বালকটি বলছে, "কবিতাটি কি তোর লেখা?"
সময়ের নিয়মে যদিবা বড় করে খুলে যাওয়া হাঁ প্রায় বুঁজে এল, তখন এল আরেক মোক্ষম বাণী, "জানিস, আমিও কবিতা লিখতাম।"

এরপর গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল প্রবাহিত। সমুদ্র উপচে সুনামি প্রকোপে সভ্যতার দিশাহারা চেহারা। এমত অবস্থায় কোন এক সাধারন পল্লীর বাজারে, এক আনাজ বিক্রেতা বিস্তর কাগজ চর্বন করে, একদিন ভরা সকালে, এক হাতে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ওজন করতে করতে আশ্বাস দিলেন, "আমাদের এখানে সুনামি আসবে না।"
পারিপার্শিক মানুষেরা কৌতুহলে ফিরে তাকায় বিশেষজ্ঞের মতামত জানার জন্য। জ্ঞানী সবজি বিক্রেতা অত্যন্ত সপ্রতিভ কন্ঠে পর্যালোচনা করেন, "আসলে এই সুনামির জন্য পৃথিবীর নিচ থেকে প্রচুর গ্যাস জন্মায়। আর আমাদের চারিদিক অনেক ইন্টারনেট আছে। সমস্ত গ্যাস ইন্টারনেট শোষন করে নেয়। তাই সুনামির ভয় নেই।"
শ্রোতৃমন্ডলী যারপরনায় স্তব্ধ হয়ে থাকে, জানা বা অজানার শাশ্বত অন্বেষণে। 

ভোটের বালাই

একটা বড় ঠোঁটের সারস। ছেয়ে রঙের শরীর। গলার কাছটিতে সাদা। লম্বা লম্বা পা ফেলে চলেছে। ছোট্ট নদীর আঁকে বাঁকে আসকলি আর উলু ঘাসের ঝোপ। টলটল জল নদীর নিচ পর্যন্ত দেখা যায়। বিকেলের এই সময়টা বেশ মনোরম। গনগনে রোদের তাপ একটু কমেছে। দক্ষিণের বাতাসে একটু যেন আরামের ঘ্রাণ।

সাতটা মহিষ নিয়ে জলে নামে বুড়ো। পাকানো দড়ির মতো চেহারা। বিচুলি দিয়ে ঘষে ঘষে প্রতিটি মহিষের গা পরিস্কার করতে থাকে। অতগুলো মহিষকে দেখে সারসটা থমকায়। একটু সরে জায়গা দেয়। পরম যত্নে বুড়ো মহিষদের স্নান করায়। শেষ নিজে স্নান সারে।

এরপর হেট হেট করতে করতে পোষ্য নিয়ে বাড়ির পথে। পাকা রাস্তা ছেড়ে মাটিতে। ঝরা পাতায় পুরো পথ ঢাকা। বাঁশ ঝাড় পেরতে, ওপাশ থেকে ডাক আসে, "কই ঠাকুর জামাই, ঝুড়িভাজা নিয়ে গেলে না?" ডাক শুনে মহিষদের ছেড়ে দেয়। বাকি পথটা ওরা একাই যেতে পারবে। পথ ছেড়ে বুড়ো পানুদের বাড়ির দিকে ঘোরে। নিকোনো উঠোন। একটা বড় আমগাছ তলায় রান্নাঘর। ভিতর থেকে ছাঁকা তেলের ভাজা গন্ধ ভেসে আসছে। পানুর মা একটা পাটি এগিয়ে দেয়। বুড়ো লম্বা পা মুড়ে বসে। একটা বিড়ি ধরায়। একটা মস্ত গামলায় বেসনের তাল ঠাসে পানু। পানুর মা আর বৌ সেই বেসন ঝাঁঝরি করা কৌটো দিয়ে কড়াইএর উপর ঘোরায়। গোল গোল ঝুড়ি ভাজা। তারপর তেল ঝারিয়ে বিটনুন দিয়ে প্যাকেটে মোড়া হচ্ছে। পানুর মা এক বাটিতে একটু মুড়ি, গরম ঝুড়িভাজা আর কাঁচালঙ্কা এনে বুড়োর সামনে রাখে। তারপর আমগাছের দিকে তাকিয়ে ডাকতে থাকে- "বুলবুলি ও বুলবুলি।" তীক্ষ্ণ শিসে উত্তর দিতে দিতে নেমে আসে, একটা সবুজ রঙের টিয়া। পাখিটা পানুদের পোষা, নাম বুলবুলি। তবে খাঁচায় রাখতে হয় না। ও গাছেই থাকে, খাবার সময় ডাকলে, নেমে আসে ঠিক। বুড়ো বুলবুলিকে একটা ঝুড়িভাজা দেয়। লাল ব্যাঁকা শক্ত ঠোঁটে খাবার কামড়ে ধরে। তারপর গাছ বেয়ে তরতর করে রান্নাঘরের চালে উঠে বসে।
বেসন মাখতে মাখতে পানু বলে, "পিসে, খবর কেমন বুঝছ?"
 - খবর আর কি?
 - পঞ্চায়েত অফিস থেকে এসেছিল?
 - হ্যাঁ তারা তো বাড়ি বাড়ি লিস্টি মেলাচ্ছে।
 - সে তো দু মাস ধরে হচ্ছে। নতুন খবর কি?
 - নতুন আবার কি?
 - কেন তুমি ভোট দিবা না?
 - হ, ভোট তো দিবোই। টিয়ারে বুলবুলি নাম দিবি। আর সে বেটাও সাত বোগদার এক বোগদা। ডাকলে সাড়াও দেয়।
 - তুমি কি ভাব? সে কি ডাক শুনে আসে? আসে ঝুড়ি ভাজার লোভে।
 - ভোটবাবুরাও আসে। ও তো অবলা পাখি!

সর্বশিক্ষা প্রজেক্টে পানুর নাম শিক্ষক হিসেবে লেখানো আছে। ঘরে গাদা বই ডাঁই করা। খাতা ভরা ছাত্রদের তালিকা। মাঝে মাঝে উপস্থিতির চিহ্ন বসিয়ে নেয়। বই পত্তর যেমন কি তেমন ধরা থাকে। একটা মোটা ডিক্সনারি আর একটা গ্লোব আছে। পানুর ছোট ছেলেটা গ্লোবটা নিয়ে খেলা করে। আর মোটা বইটা সেলাই-এর সময় কাঁথা চাপা দেবার কাজে লাগে। চাষের কাজ ছাড়া, ঝুড়ি ভেজে তেমন যুৎসই হয় না। কয়েক বছর হল, অধীর সর্বশিক্ষার কাজটা পাইয়ে দেয়। তার বদলে পতাকা নিয়ে মিছিলে হাঁটা বা কলকাতায় যাওয়া। কিন্তু আজকাল অধীর নিজেই যেন অন্য সুর গাইছে। পানু বোঝেনা। বুড়ো কিছু বোঝে কি না, তা বুড়োই জানে।

মুড়ি শেষ করে বুড়ো ওঠে। পানু ছয়টা, ডজনের প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। বুড়ো মহিষের দুধ দিতে যায়, সাথে আজকাল ঝুড়িভাজাও রাখে। চায়ের দোকানগুলো নেয়। অধীর বলেছে, টাউনে কয়েকটা ক্যান্টিন ধরিয়ে দেবে। তবে বুড়ো খুব জানে, এখন কিছু হবার নয়। কেমন একটু ভয় ভয় করে। ভোটের পর কি আগের হিসেব মিলবে? ঘরে ফেরার পথে সারসটার দেখা পায় আবার। নদীর অন্য পাড় দিয়ে চলেছে, সতর্ক পায়ে।   

শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৬

বিজয়া


আজ দশমী। এবার আমাদের পাড়ার থিম ছিল লাইভ ঠাকুর। মোড়ের মিষ্টির দোকানের ময়রা হয়েছিল গণেশ, বলিউডের স্বপ্নে বিভোর ঋত্বিক হয়েছিল কার্তিক, পাড়ার হার্টথ্রব চিনির বোন মিনি হয়েছিল সরস্বতী। চিনি রাজি হল না, তাই অপর্ণাদি লক্ষ্মী। জিম করা গুলেদা অসুর আর পাড়ার রাঙামাসি দুর্গা। সবাই কে হেব্বি মানিয়েছিল। ঋত্বিকটা মিনির দিকে কয়েকদিন যাবৎ একটু কার্নিক খাচ্ছিল। সুযোগটা পুরো কাজে লাগালো। মহালয়ার দিন থেকে ওদের রিহার্সাল। বেদান্ততীর্থ থেকে নিয়মিত যোগ আর ডায়েট চার্ট করে দিয়েছিল। দেবত্ব অর্জন যে সে কথা! দুবেলা সবাই "মা-মা" করে পুজো করল, অঞ্জলি দিল, ধুনুচি নাচল। শুধু বিসর্জন দেবার সময় দর্পণেই খেল খতমঋত্বিক দেবীপক্ষের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মিনির পাশেকতটা চিঁড়ে ভিজেছে, তা সময় বলবে। ময়রার ভুঁড়ো পেট নিয়ে চলতে ফিরতে অসুবিধে। সেও কটিয়ে দিল কটা দিন। রাঙামাসির বড় বড় চোখ। এমনিতেই ভীষণ মা মা। দশহাতে বড় সুন্দর লাগছিল। দর্শকরা সবাই এমন করছিল, সত্যজিতের দেবী সিনামা মনে পড়ে যাচ্ছিল। গুলেদা স্পোর্টসম্যান। মাসল দেখাতে কোন আপত্তি নেই। চিনি না থাকায় ঋত্বিকের লাভগার্জেনগিরি ফলাবার কেউ ছিলনা মিনির সাথে চমৎকার সেটিং হল। কত ছবি যে একসাথে উঠল তার আর লেখাজোখা নেই।

কর্মকর্তারা খুশি। বিজ্ঞাপনে ভালো রোজগার হয়েছে। পাড়াতে খোলতাই মেজাজ। মিষ্টিমুখ আর কোলাকুলি চলছে। ক্লাব ঘরের এক কোনাতে ঋত্বিক আর মিনি প্রসাদের দৈ-চিঁড়ে খাচ্ছিল। ঋত্বিক একটু গলা নামিয়ে বলল, "কাল বিকেলে তো আর শো নেই। তোমার সাথে কি করে দেখা হবে?"

- কেন বলতো? কিছু জরুরি?

- তা একটু জরুরি তো বটেই।

- কিছু বলবে? সে তো এখানেই বলতে পারো?

- না এখানে সবার মাঝখানে একটু চাপ আছে।

- তোমাকেও আমার একটা জিনিস দেবার আছে।

- কি?

ঋত্বিক আগ্রহে ফেটে পরে। দশদিনের পাশাপাশি থাকা, মিনি নিশ্চই বুঝেছে

- দিচ্ছি বাবা দিচ্ছি। আমি নিয়েই এসেছিলাম। তেমন কিছু নয়, আমাদের এই শো-র একটা স্মারক। কার্তিক, সরস্বতীর ভাই না দাদা? যাই হোক, এখন থেকে আমি তোমার বোন হলাম কেমন?"। এই বলে ঋত্বিকের ডান হাতে রেশমের দড়ি বেঁধে দেয়। ঋত্বিকের মুখটা চুপসানো বেলুনের মতো নিভে যাচ্ছিল  

এম-ও-ডাব্লু-৩০১

ট্যাক্সি ধরলাম অফিসের সামনে থেকে। ক্লান্ত, তাই উঠেই সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম। অনেক রাত হয়ে গেল আজ। হঠাৎ ড্রাইভারের সিটের পিছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম। এম-ও-ডাব্লু-৩০১। তিন মাসে চারটে খুন। প্রত্যেকটা লাশের কাছে পাওয়া গেছে, একটা বিশেষ নম্বর প্লেট। পুলিশ জানিয়েছে, নম্বরটার কোন অস্তিত্ব নেই। কাগজ আর টেলিভিশনে অনর্গল চর্চা, এম-ও-ডাব্লু-৩০১-র পরবর্তী নিশানা কে? পুলিশ প্রশাসন অন্ধকারে হাতড়ে চলেছে। অপরাধ সংগঠিত হয়েছে মধ্যরাতে কোন-না-কোন হাইওয়ের ধারে। পোস্টমর্টেম বলছে, মৃত্যুর কারণ বিষাক্ত গ্যাস। বুঝলাম ফাঁদে পড়েছি। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। এসি-র সাথে মিষ্টি গন্ধ। পকেট থেকে মোবাইল বার করি। ঘাড় না ঘুরিয়ে ড্রাইভার বলে, "স্যার জ্যামার আছে। নেটওয়ার্ক কাজ করবে না।" ড্রাইভিং মিরর দিয়ে চোখ দেখা যাচ্ছে। শান্ত মেজাজ। যেন কোন তাড়া নেই। আমার গলা দিয়ে স্বর বেরয় না।
- কি যা তা বলছেন?
- যা তা নয় স্যার। যা ভাবছেন, ঠিক তাই। মার্ডার-অন-হুইলে আপনাকে স্বাগত জানাই।
- কেন? আমি কি করেছি?
- আমরা কেউ কিছু করি স্যার? সবই আগে থেকে ঠিক। আমরা নিমিত্ত মাত্র।
- প্লিজ আমায় নামিয়ে দিন।
- এ ভাবে বলবেন না। দুর্বল লাগে। বিশ্বাস করুন, কোন কষ্ট হয় না। প্রথমে আমরা হাইওয়ের দিকে যাবো। তারপর এই এসি-র সাথে ঘুমের গন্ধটা আসবে। দেখবেন খুব ভালো লাগবে।
গাড়ীর হাতল টানাটানি করতে থাকি। আবার সে শান্ত গলায় বলে, "কোন লাভ নেই, সেন্ট্রাল লক। বিশেষ ভাবে বানানো। আমার এখান ছাড়া খুলবে না।"
রাস্তা হাইওয়েতে ওঠে। আমি বলি, "আপনার কত টাকা চাই?"
- টাকার জন্য মার্ডার-অন-হুইল কাজ করে না। এটা একটা মিশন। পৃথিবী কে ভার মুক্ত করতে হবে।
- আমি পৃথিবীর ভার! আপনাকে কে বলল?

লোকটি চোখ দিয়ে হাসল। কিন্তু চুপ করে থাকলে হবেনা। আজ সাথে ল্যাপটপের ব্যাগটাও নেই, যা দিয়ে আঘাত করা যায়। হঠাৎ একটা কালো বেড়াল দ্রুত রাস্তা পার হয়। প্রবল শব্দে ট্যাক্সি দাড়িয়ে যায়। ইগ্নিশন অফ করতেই সেন্ট্রাল লক খোলার শব্দ হয়। আমি কিছু না ভেবে দরজা খুলে বাইরে ঝাঁপ দিলাম। অদূরে একটা টহলদারি গাড়ী। ট্যাক্সিটা স্পীড তুলে অন্ধকারে হারিয়ে যায়।      

বাথটাব

মধ্যবিত্ত গেরস্ত ঘরে বাথটাব শব্দটি বিদেশি। একসময় বাথরুমেরও তেমন চল ছিল না। পাড়ার পুকুরে বা নদীতে গণস্নানের অনন্য মজা। পরে এল সার্বজনীন কল পাড়। যেখানে পাড়ার সবাই মিলে লাইন দিয়ে স্নানের আয়োজন। সম্পন্ন মানুষ নিজগৃহে তৈরি করলেন ব্যক্তিগত কলপাড়। সেখানেই বাসন মাজা গা মাজা দুই চলত। কোন কোন রাস্তার কলে গবাদিপশুর স্নানও সমান প্রচলিত।

ক্রমে কলপাড় হল কলঘর। সংযোজন হলে আরেকটি অবতারঃ চৌবাচ্চা। কেন যে এই অসামান্য শব্দটির উদ্ভাবন হল, সমাজ ও ভাষা বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন। কলঘরের চিত্রকল্প ও তার ব্যবহার বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমে বারে বারে হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। তার শ্যাওলা ধরা, নোনা লাগা শরীর। আধো অন্ধকারে একটি চল্লিশ পাওয়ারের বাতি। সব মিলিয়ে গল্পের আঁতুরঘর। সেই কলঘরে বা কল সংলগ্ন চৌবাচ্চায় গা ডুবিয়ে অবগাহন করার ভাবনায় সুখ আছে, তবে সেই সুখ কতজন পেয়েছেন জানা নেই।

পুলকদের বাড়িতে এমন একটি চৌবাচ্চা ছিল। পুকুরে নামতে পুলকের বড্ড ভয়। তাই রোজ স্বপ্ন দেখে, চৌবাচ্চায় ডুব দেবার। তবে ওদের চৌবাচ্চাটি ছিল এজমালি। অর্থাৎ কলঘরের বাইরে যেখানে আড়াল তো নেই, উপরন্তু এক দুই বা তিন তলার বারান্দা থেকে অনায়াসে দেখা যায়। আর দেখা গেলেই শরিকী বিদ্বেষের সানাই বেজে ওঠে। বুকের মধ্যে সেই স্নানটা জমিয়ে রেখে কোন রকমে কলঘরের অন্ধকারে মগ বালতি ব্যবহার করে পুলক।

সেবার পুলকের কাকা কোন এক সাহেবি বাড়ি ভাঙার কাজ পেয়েছিল। সেই বাড়িতে ছিল পেল্লায় এক বাথরুম। আর সেখানে ছিল এক বড়সড় বাথটাব। কাকা কি মনে করে প্রাণে ধরে ওই বস্তুটি বিক্রি করতে পারেননি। আদ্যিকালের ধাতব বাথটাব, না কি বিরাট আকার কড়াই! বাড়ির ছাদে তার অবস্থান হল। পুলক মাঝে মাঝে ছাদে এসে ওকে হাত বোলায়। এর মধ্যে একদিন তুমুল বৃষ্টির দিন। পুলককে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। বন্ধুরা যারা মাঠে বল পেটাচ্ছিল, তারাও ঘরে ফিরে এসেছে। পুরোন বাড়ি, তার দালান কোঠার আনাচ কানাচ ঢুঁড়ে কারা ছাদে এসে উপস্থিত। বৃষ্টির তোড় তখন ঝালাতে। ছাদের ওপর ফোঁটায় ফোঁটায় অজস্র জুঁইয়ের জন্ম হচ্ছে আবার নিভে যাচ্ছে। তার মধ্য সকলে অবাক হয়ে দেখে, অমন জলের ধারায় সেই সাহেবি বাথটাব কানায় কানায় পরিপূর্ণ। আর তাতে আকন্ঠ নিমগ্ন পুলক। যেন কতদিনের স্নান, যা এতদিন ধরে বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছিল। আগল খোলা বাঁধের মতো উছলে উঠছে। তাকে যে কেউ দেখছে, তার কোন হুঁশ নেই। যেন প্রথমবার পুলক নামের সার্থকতা খুঁজে পেল।

এখনও পুলকদের বাড়ি গেলে সেই বাথটাবটা দেখতে পাই। তবে সেটির ভেতর মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। লাগানো আছে লেবুগাছ। তাতে লেবু ধরেছে কতক। বর্ষায় লেবুফুলের থেকে কোন হারানো কৈশোরের তৃপ্ত স্নানের ঘ্রাণ ভেসে আসে।

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

বর্ষশেষের গাল গল্প

নষ্টলয়জ শব্দকে মানুষ ভালোবাসে। অনেকেই রোমন্থনমুলক শব্দসম্ভার লিখে প্রভুত আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। তাঁর পাঠকেরাও হয়তো সে আনন্দের ভাগ পান। সব পাঠক, লেখকের সাথে একই সময় সরণী ভাগ করেছেন, তা নয়। যাঁদের সেই তন্ত্রীতে সাড়া জাগে, তাঁদের ভালোলাগার মাত্রা অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র। কোনভাবে সেই লেখা সার্বজনীন হয়ে ওঠেনা। অন্যদিকে লেখা ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকেও বিরত থাকে। কতকটা দূরে দাঁড়িয়ে, ব্যক্তিগত উপলব্ধির চারন। তা সে, "যার যেমন তার তেমন" গোছের।

ওদিকে বেলা তো বসে থাকে না। সে আসে যায়, আবার আসে। সাথে নতুনকে নিয়ে আসে, গরম শীত, বর্ষা সব। এমন কি তার সাথে পাল্লা থাকে খরা, বন্যা, দূর্বিষহ দূর্ঘটনা। ক্যালেন্ডার এক অসামান্য স্মারক। দিনের মেয়াদী পাতা। উল্টে গেলেই দিন শেষ।

এ নিয়ে বেশ চলে। চৈত্রশেষে সেল রোদ্দুরের সাথে নামতা মাপে। বাস চালক পরনের উর্ধাবাস খুলে রাখে। রাজপথের ধোঁয়া ওঠা পিচে, তার চরনচিহ্ন রেখে যায়। বন্ধ দোকানের গা ঘেঁষে রোঁয়া ওঠা সারমেয় ঝিমোচ্ছে। নগরায়নের তাগিদে গাছেরা চলে গেছে। পড়ে আছে ছায়াহীন অবয়ব। মানুষ, পশু, পাখি সকলেরই খিদে বড় বালাই। তার জন্য ছুটে চলা। দ্বিপ্রহরের দাব উপেক্ষা করে অনেকানেক মানুষ এখনও পথে। কেউ আখের রস খায়, কেউ চা। রঙিন পানীয়র দামি বোতলও হাত ঘুরে যায়। হাত অনুসারে দাম। চাষীর হাত, মজুরের হাত একেক রকম। শিল্পীর হাত? আড়ালই ভালো? সেখানে ধুলো পড়ে না? রঙ ওঠে না? কন্ডাকটারের অপরিসীম ধৈর্য্য আর বিরক্তির সহাবস্থান। "এখানে স্টপেজ নেই।" কার কোথায় থামা দরকার, পুলিশ বা ভগবান কে জানে? সে কথা কে বলবেন? ওদিকে অটো স্ট্যান্ডে মানুষ উঠে বসে আছে, চালক কে পাওয়া যাচ্ছে না। গরমের ত্রাসে সবাই যেন চালকহীন। একজন ছুটে এসে ইস্তাহার ধরিয়ে গেল। ভোটের প্রচার লিপি। পেটের মতো ভোটও বড় বালাই। চোখ বোলাতে কয়েকটি নাম চোখে পড়ে। যাঁরা জীবিত কিনা জানা ছিল না, গত ভোটের পর তো এঁদের দেখা বা শোনা যায়নি। সে যাই হোক, গাড়ি চালক ঘামতে ঘামতে দর্শন দিলেন। এক গাল হেসে বলেন, পান খেতে গিয়েছিলেন। রক্তাক্ত মুখ তাই বলে। পান করতে জাননি, জেনে ভালো লাগে।

সময় গড়িয়ে যায়। ধুলো পথ, জয়বাবা তারকনাথের দেখা দেয়না। চড়কের দল মুখ লুকিয়েছে। বড় মাল্টিপ্লেক্স বাতির রোশনাইতে সর্বস্য ঢেকে যায়। পঞ্জিকা কিনতে দর করতে নেই। ভবিতব্যের কি মূল্য হয়? সে তো এমনি আছে, অমনিও রইল।  তোমার আমার বছরভর প্রাপ্তি। নীল পুজো, অশোক ষষ্ঠী কোনরকমে টিঁকে থাকে। বাঙলার ঘর আদুর হয় ডুবে যাওয়া সূর্যের শেষ রশ্মিতে। সারাদিনের তিক্ততা ঘুরে বসে। সন্তানের শুভ কামনায় জড়ো হয় নতুন বালিশ ও পোশাকের ঘ্রাণ। 

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

গ্রাম শহর বিভাজন

সময় পাল্টেছে খুব দ্রুততায়। আজ গ্রাম আর শহরের সেই বিভাজন আর নেই। টেলিভিশনের দৌলতে প্রত্যেকের অন্দরমহলে পৌঁছে গেছে অত্যাধুনিক সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতির স্বাদ রূপ গন্ধ অতি সহজেই। উপগ্রহ চ্যানেলের উপস্থিতি চোখে পড়ে প্রতিটি বাড়িতেই। এমন কি যাঁরা দিন মজুরি করেন, তাঁদের ঝুপড়িতেও। সব যেন এক ছাঁচে ঢালা। সেই সময় যে মৌলিক বৈশিষ্ট ধরা পড়ত, তা সময়ের ক্ষমতা বলে বড়বেশি এক রঙা। আগে প্রতিটি নগর বা গ্রামের একটা নিজস্ব চরিত্র ছিল। সেই জায়গায় পৌঁছলেই, তা দৃ্শ্যত প্রতীয়মান হত। এখন যে ঘাটেই নোঙর ফেলি না কেন, পরিচিত বহুজাতিকের বিশালাকায় বিজ্ঞাপনের একই মুখ চোখে পড়ে। সে আমার শহর তোমার শহর, বা তোমার গ্রাম আমার গ্রাম সর্বত্র।

সেদিন আমার এক নিমন্ত্রণ ছিল। আমাদের বাড়ির রান্নামাসির নাতির অন্নপ্রাশন। ওদের বাড়ি, শহরাঞ্চলের পরিধি ছাড়িয়ে শহরতলির প্রান্তে। রান্নামাসির ছেলে গাড়ি চালায়, আর স্বামী রিক্সা। ছোট্ট বাড়ি, মাথার ওপর টিনের চাল। পরিপাটি, গুছোনো সংসার। ঘরে টেলিভিশন চলছে। আপ্যায়নে ফাঁক নেই। নিমন্ত্রিতরা বেশিরভাগ শ্রমজীবি মানুষ। লক্ষ্য করলাম, বেশিরভাগ মানুষের পোশাক, অত্যন্ত অধুনিক ছাঁচের। যেমনটি আমরা এখনকার সিনামা, সিরিয়াল বা বিজ্ঞাপনে দেখতে পাই। একটু ফারাক এই যে, পোশাকগুলি হয়তো নামি ব্র্যান্ডের নয়। তবে তার নক্সা এবং সৌন্দর্য্য কোন অংশে কম নয়। মহিলাদের চোখে মুখে প্রসাধন চর্চার প্রভাব সুস্পষ্ট। আমাদের রান্নামাসি, যিনি সম্পর্কে ঠাকুমা হয়েছেন, তিনি নিয়মিত দোকানে গিয়ে রূপচর্চা করেন। আর খুব লাজুকমুখে কবুল করলেন যে, আজকের জন্য তিনি বিশেষ পরিষেবা নিয়েছেন। সে সব মালিশ, চুলের নক্সা বা স্পা সম্পর্কে আমি বা আমার গৃহিনীরও সম্যক ধারনা নেই। পাত পেড়ে খাওয়া, উপহার দেওয়া তো রয়েছেই, সাথে ডিজে মিউজিক সহকারে ডান্স ফ্লোরের ব্যবস্থা। সেখানে নাতি, নাতনি, ছেলে, মেয়ে, বৌমা, আত্মীয়, নিমন্ত্রিত সবার সাথেই আমাদের রান্নামাসি ও তাঁর পরিবার অত্যন্ত সাবলীল। আমার নিজেকে যেন  পিছিয়ে পড়া মানুষ বলে মনে হল, যখন অত্যন্ত আন্তরিক ভাবে নাচের আঙিনায় যাবার অনুরোধ ফেরাতে হয়। কি করব ওই বিদ্যেটা তো তেমন রপ্ত হয়নি।

গৃহকর্ত্রী বেশ কড়া অনুশাসনে রেখেছে বোঝা গেল। এতসব আনন্দ উপাদানে উৎশৃঙ্খলা নজরে আসেনা। মদ্যপানের ব্যবস্থা অন্ততঃ খোলা চোখে পড়েনি। সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য সন্ধ্যা কাটিয়ে এলাম। মাথার মধ্যে কিছু এলোমেলো চিন্তার বাতাস ঘোরাফেরা করে। এমনটা কি হবার কথা ছিল? না কি আমি বেশি ভাবছি? আমার তথাকথিত উন্নাসিক 'সভ্যতার' নিরিখে এই মানুষগুলো কে প্রত্নউপাদানের মতো, সময়ের ফসিল হিসেবে দেখতে না পেয়ে, কি বিচলিত হচ্ছি? বিদায় নেবার সময়, আমাদের নাচের আঙিনাতে পায়নি বলে বেশ আক্ষেপ শোনা গেল। আমার এ দূর্বলতা কে আমি কি প্রচ্ছন্ন গর্ব মনে করেছিলাম? যা আজ ধ্বসে যাচ্ছে বলে কষ্ট হল? 

ব্লগ এবং বই পাওয়ার ঠিকানাঃ https://souravstory.com

 এখন থেকে ব্লগ সহ অন্যান্য সব খবর এবং বই পাওয়ার ঠিকানাঃ https://souravstory.com